ভালো থাকুক প্রতিটি নারী

যখন পৃথিবীতে প্রথম ভোরের আলো ফুটেছিল, তখন সূর্যের আলো যেমন মাটিকে আলোকিত করেছিল, তেমনি একজন নারীর কোলেই জন্ম নিয়েছিল মানবতার প্রথম আশ্রয়। ইতিহাসের প্রতিটি মহান মুহূর্ত প্রতিটি বিপ্লব, প্রতিটি জাগরণ, প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন নারী। হতে পারেন তিনি একজন মা, যিনি শিশুর চোখে স্বপ্নের আলো জ্বালান। কিংবা একজন শিক্ষিকা, যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের দীপ জ্বালান। অথবা তিনি হতে পারেন সংগ্রামী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর কারিগর। গ্রিক পুরাণের এথেনা যেমন জ্ঞান ও ন্যায়ের দীপশিখা, তেমনি বাংলার মাটিতে বেগম রোকেয়া তার পথচলা দেখায় নারী সংগ্রাম শুধু ইতিহাস নয়, জাগরণের আলোক পথ। তবুও সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে নারীকে করা হয়েছে বারবার অবহেলিত, হয়েছে তার শক্তিকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা।

তাই ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল একটি দিবস নয় এটি ইতিহাসের কাছে একটি প্রশ্ন, বিবেকের কাছে একটি আহ্বান, এবং ভবিষ্যতের কাছে একটি অঙ্গীকার। এটি সেই দিন, যেদিন মানবতা নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয় নারীকে সম্মান করা মানে মানবতাকে সম্মান করা, নারীকে এগিয়ে নেওয়া মানে সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়া। টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ১৯৭৫ সালে এই দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট-বাংলাদেশ আজ নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ শ্রমিক নারী, যারা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ প্রায় সমান হয়েছে ছেলেদের সঙ্গে (কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগিয়েও গিয়েছে)। বেগম রোকেয়ার একটি উক্তি এ ক্ষেত্রে সার্থকতা পেয়েছে আর তা হলো ‘নারীকে অবদমিত রেখে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না।’ ধর্মীয় ও সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নারীর মর্যাদা সর্বোচ্চ। ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনে বলা হয়েছে : ‘আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩) আর তাছাড়াও নারীকে দেওয়া হয়েছে অন্যরকম সম্মান যা অন্য সব ধর্মকে ছাপিয়ে গেছে। হিন্দুধর্মে দেবী দুর্গা শক্তির আধার, আর সরস্বতী জ্ঞানের প্রতীক। খ্রিস্টধর্ম : ইরনষব-এ লেখা : “এড়ফ পৎবধঃবফ সধহশরহফ রহ ঐরং ড়হি রসধমব... সধষব ধহফ ভবসধষব ঐব পৎবধঃবফ ঃযবস.” (এবহবংরং ১: ২৭) বৌদ্ধধর্ম : গৌতম বুদ্ধ নারীদের আধ্যাত্মিক চর্চায় সমান অধিকার দিয়েছিলেন। বাস্তব চ্যালেঞ্জ তবুও বাস্তবতা এখনো কঠিন : সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সীমাবদ্ধতা। গ্রামের মেঠোপথের একটি দৃশ্য : রাস্তার ধারে এক মেয়ে বইয়ের প্যাকেট বয়ে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। তার চোখে আগুন, কিন্তু পরিবারের তার ওপর আলাদা কোনো আশা নেই। তবু সে যায়। এই মেয়েটিই হয়তো আগামী দিনে দেশের অগ্রগতির ইতিহাস রচনা করবে এবং আমাদের মেয়েরা শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তা করে দেখাচ্ছে।

তাই করণীয় নির্দেশনা : শিক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা, প্রতিটি মেয়ের জন্য হতে হবে। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতা পরিবর্তন আনতে হবে।

নারী দিবস কেবল একদিনের ফুলেল দিবস নয়, কিংবা একদিনের অনুষ্ঠানও নয় এটি একটি প্রতিশ্রুতি, আহ্বান এবং মানবিক অঙ্গীকার। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” আজ নারীকে পেছনে রেখে কোনো জাতি এগোতে পারবে না। আসুন আমরা প্রত্যেকে নারীকে সম্মান করি, তাদের অধিকার রক্ষা করি এবং মানবতার এক নতুন ইতিহাস লিখি যেখানে সমতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা হোক প্রতিটি মুহূর্তের অংশ। নারীকে সম্মান করি কারণ নারীই মানবতার প্রাণ। ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শন একসুরে বলে নারী কোনো প্রান্তিক সত্তা নন; তিনি মানবতার কেন্দ্র। “যে হাত দোলনা দোলায়, উদায়স্ত পরিশ্রম করে সেই হাতই পারে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিতে।” ভালো থাকুক প্রতিটি মেয়ে, প্রতিটি পরিবার একটি দেশ, একটি জাতি!

লেখক: কনসালটেন্ট কিডনি রোগ বিভাগ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল