মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে নতুন মোড়

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মুখে পারস্য উপসাগর তীর ও আশপাশের অঞ্চলে ইরান টানা পাল্টা হামলা চালিয়েছে সাতদিন ধরে। এরপর গতকাল শনিবার অষ্টম দিনে এসে যুদ্ধে নতুন বাঁক এনেছে ইরান। দেশটির সরকার যুদ্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোকে শর্তসাপেক্ষে হামলার লক্ষ্যবস্তু না করার ঘোষণা দিয়েছে।

ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান গতকাল বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যদি ইরানকে লক্ষ্যবস্তু না করে, তাহলে তাদের ভূখ-ে পাল্টা হামলা স্থগিত রাখার একটি প্রস্তাব ইরানের অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ অনুমোদন করেছে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তেহরানের হামলা বন্ধ হতে যাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যেসব হামলা হয়েছে, সেগুলোর জন্য তাদের কাছে দুঃখও প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।

এদিকে, মার্কিনিরা হামলা আরও জোরদার করার ঘোষণা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের তীব্রতা কমাতে এবং বিশ্ববাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে সৌদি আরব। ইউরোপীয় কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের কূটনীতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে এবং সংঘাত আরও খারাপের দিকে যাওয়া ঠেকাতে গত কয়েক দিন ধরে জরুরি যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে গতকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে ইরানকে খুব একটা আগ্রহী মনে হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায় ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে কাতার, তুরস্ক, মিসর ও ওমান বিভিন্ন সময় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে দিন কয়েক আগে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এখন কূটনীতির সময় নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষার সময়।

তবে গত শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘মধ্যস্থতা তাদের উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত যারা ইরানি জনগণকে অবমূল্যায়ন করেছে ও এই সংঘাত শুরু করেছে।’

প্রতিবেশী দেশগুলোয় ইরানের হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানানোর আগে আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখা। তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ইরানি ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিমানঘাঁটির আগাম সতর্কতা সংকেত ব্যবস্থা এবং ফায়ার কন্ট্রোল রাডারগুলোতেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার বিষয়ে পেজেশকিয়ানের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রুথ সোশ্যালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করবেন না তিনি। ট্রাম্প বলেন, ইরানের আত্মসমর্পণের পর নতুন ‘গ্রহণযোগ্য’ ইরানি নেতাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনে সাহায্য করবে।

একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে পেজেশকিয়ানের ‘দুঃখপ্রকাশ’কে ‘ইরানের আত্মসমর্পণ’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার মুখে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নতি স্বীকার করেছে ইরান।

জবাবে গতকাল শনিবার ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি একটি স্বপ্ন যা তাদের কবরে নিয়ে যাওয়া উচিত।’

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যেও চলমান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরেই বিভক্তি তৈরি হয়েছে। হামলার এক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রতি দলীয় সমর্থন বিভক্ত হয়ে গেছে। ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন কি না, সে প্রশ্নে কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়েছে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট ট্রাম্পের যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিলেও, সামনের দিনগুলোতে এই চিত্র বদলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। কেননা ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক আইনপ্রণেতাই প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধিতা করেছেন। ইরান যুদ্ধের জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। বার্তা সংস্থা এপি জানায়, কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, মার্কিনিদের যুদ্ধ পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে তারা হতাশ। ইরানের ওপর হামলার আগে তাদের যথেষ্ট সময় দিয়ে সতর্ক করা হয়নি। আগাম কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাদের দেওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে।

উপসাগরীয় একটি দেশের এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েল ও তাদের নিজস্ব সেনাদের সুরক্ষায় মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের রক্ষার জন্য ছেড়ে দিয়েছে।

আর ট্রাম্প ইরানে গতকাল ভয়াবহ আঘাতের হুমকি দেন। নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) ইরানে খুব ভয়াবহভাবে আঘাত হানা হবে।’ উপসাগরে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স নিউজ জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ গত বৃহস্পতিবার মোতায়েন-পূর্ব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। সংঘাতময় এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বি-১ বোমারু বিমান। ৮৬ টন ওজনের বি-১ ল্যান্সার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর দ্রুততম বোমারু বিমানগুলোর একটি। বিবিসি জানিয়েছে, ২৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম ১৪৬ ফুট দীর্ঘ এই বোমারু বিমানটি।

এর পাল্টা জবাব দিতে এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নতুন সম্পদ বা সামরিক স্থাপনা চিহ্নিত করছে বলে তেহরান থেকে দাবি করা হয়।

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ছয় বছর আগে করোনা মহামারীর পর এক সপ্তাহে তেলের দামের এত বড় উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব জুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করেছে।