নারীর সংগ্রাম স্বপ্ন অধিকার

গতকাল ৮ মার্চ পালিত হলো, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপনের জন্য নয়; সেদিন আমাদের সামনে উঠে আসে নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমতার স্বপ্নের চিত্র। আমরা শুধু নারী দিবস উদযাপন করি না, বরং নারী ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে নতুন প্রাণ দিই। নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা এককভাবে পুরুষের দ্বারা নির্মিত হয়নি; নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে সমাজ এগিয়েছে। এটা সত্য, ইতিহাসে নারীর অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। সামাজিক প্রথা, কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ক্ষমতার অসম বণ্টন নারীকে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রেখেছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংগ্রাম করছেন । বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর সংগ্রাম ও অগ্রযাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে যখন সমাজে নারীশিক্ষা ছিল প্রায় অগ্রহণযোগ্য, তখন একদল অগ্রগামী মানুষ নারী জাগরণের জন্য কাজ শুরু করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এই বেগম রোকেয়া ছিলেন নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতার এক অনন্য পথিকৃৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া নারীর মুক্তি অসম্ভব। সমাজের প্রবল বাধা সত্ত্বেও তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। তার লেখনীতে নারী অধিকার, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক সংস্কারের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে, নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনে অনেক নারী সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সাহসী সদস্য ছিলেন। একই ভাবে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানে বিপ্লবীদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই বিপ্লবী নারীরা কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশ নেননি; তারা সমাজের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, এমনকি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নারীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আহতদের সেবা করেছেন, শরণার্থীদের সহায়তা করেছেন এবং অনেক নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যাদের আমরা ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে সম্মান করি। বীরাঙ্গনাদের সাহসিকতা ও ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্টের আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি ছিল সেই হাজারো অজ্ঞাতনামা নারী, যারা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে রাজপথে নেমে নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্য ভুবনে নারীর অবদান সমৃদ্ধ। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সুফিয়া কামাল, সেলিনা হোসেন, শাহীন আখতার এবং আরও অনেকে সাহিত্যের মাধ্যমে নারীজীবন, স্বাধীনতা, সমাজ সংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধকে তুলে এনেছেন। তাদের লেখনী সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীর উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান। সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার ফুটবলে, সালমা খাতুন, জাহানারা আলম ক্রিকেটে, শিরিন আক্তার অ্যাথলেটিকসে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত। বিশেষভাবে দাবায় রানী হামিদ বাংলাদেশের নারী দাবাড়ুদের পথিকৃৎ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে WIM (Woman International Master) খেতাব অর্জন এবং বহুবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, নারীর ক্ষমতা কোনো ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়।

তার কৌশল, ধৈর্য এবং অদম্য মনোবল দেখিয়েছে নারী কেবল ঘর-সংসারের সীমায় আটকে নেই, বরং প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলা, বিজ্ঞান, শিক্ষা বা যে কোনো পেশাগত ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হতে পারে। এটি আমাদের শেখায়, সমাজে নারীর সম্ভাবনাকে কখনো হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং তার দক্ষতা, নেতৃত্ব ও প্রেরণাকে সমানভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তার এই অর্জন শুধু তার ব্যক্তিগত গৌরব নয়, বরং সমগ্র নারী সমাজের সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। শিক্ষিত ও স্বনির্ভর নারী কেবল নিজের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যান না, বরং পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তারা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে অপরিসীম অবদান রাখেন। বাংলাদেশে নারীরা উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষিকা, চিকিৎসক, গবেষক এবং সরকারি চাকরিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, শারমিন আক্তার স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং মাসুদা ফারুকী সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছেন। এছাড়াও রুবানা হক, ফারজানা চৌধুরী প্রমুখ নারী প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতেও নারী নেতৃত্বের উদাহরণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন নিশাত ওমর, সামিয়া হোসেন, সাবিনা খাতুন এবং কৃষ্ণা রানী সরকার বিভিন্ন ডিজিটাল ও ই-কমার্স উদ্যোগে নারীর ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা মনোভাব প্রদর্শন করছেন। নারীর অবৈতনিক শ্রম, অর্থাৎ গৃহস্থালি ও যত্নমূলক কাজ, দেশের অর্থনীতিতে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই শ্রমের মধ্যে রয়েছে রান্নাবান্না, বাসা পরিচ্ছন্নতা, বস্ত্র-কাপড়ের যত্ন, পাশাপাশি শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধদের দেখাশোনা। Bangladesh Bureau of Statistics (BBS)-এর ২০২১ সালের Household Production Satellite Account (HPSA) রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর এই অবৈতনিক শ্রমের মোট মূল্য প্রায় ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা (৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা), যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮.৯ শতাংশের সমমূল্য।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই শ্রমের ৮৫ শতাংশেরও বেশি অংশ নারীর দায়িত্বে থাকে, যা দেখায় যে নারীর অদৃশ্য শ্রম দেশ ও পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিভিন্ন আইন নারীর অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংবিধানের ধারা ২৮ অনুযায়ী নারী ও পুরুষ সমান অধিকারী, যা নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে সমতার ভিত্তি স্থাপন করে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনও নারীর নিরাপত্তা, সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকরভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধ করে, অপরাধীদের দণ্ড এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ গৃহে নারীর শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধ করে এবং হেল্পলাইন ও আদালতের মাধ্যমে সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করে। এছাড়াও, এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ নারীর ওপর এসিড হামলা প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করে। কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা, ২০০৯’ কার্যকর রয়েছে। অফিস ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে এবং হেনস্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল, তদন্ত ও শাস্তি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে। তদুপরি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ নারীর কর্মসংস্থান, সমান অধিকার, নিরাপদ পরিবেশ, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সমান মজুরি নিশ্চিত করে। তবে এই সব আইন কার্যকর করতে সামাজিক সচেতনতা, মানসিকতার পরিবর্তন এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ অপরিহার্য, যাতে নারীর অধিকার ও সুরক্ষা যথাযথভাবে রক্ষা পায়। বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন ও সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

সংবিধান ও বিভিন্ন আইন যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, এসিড অপরাধ দমন আইন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা এবং শ্রম আইন-নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকরভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে আইনের বাস্তবায়ন এবং নারীর পূর্ণ ক্ষমতায়নের জন্য সামাজিক সচেতনতা, মানসিকতার পরিবর্তন ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ অপরিহার্য। বাংলাদেশের নারীরা কখনো কেবল দর্শক ছিলেন না; তারা ছিলেন পরিবর্তনের অগ্রদূত। বেগম রোকেয়ার শিক্ষা ও নারী জাগরণ, মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ এবং সমকালীন আন্দোলনে তরুণীর অংশগ্রহণ এ সত্যের সাক্ষ্য। ফলে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে সমাজ ও জাতির প্রকৃত অগ্রগতির ভিত্তি। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রকৃত অর্থও এখানেই নিহিত। নারীর অগ্রযাত্রা মানেই মানবতার অগ্রযাত্রা যা গতকাল আমরা পার করে এলাম। সেই দিনটি শুধু ‘দিবস’ হিসেবে নয়, চৈতন্যের গভীরে প্রোথিত থাকুক বছরের প্রতিটি দিন নারীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা দিয়ে। আমরা যেন একজন প্রকৃত ‘মানুষ’ হিসেবে নিজেকে উদ্বোধন করতে পারি। শ্বাশ্বত, সুন্দর থাকুক মার্জিত বোধ। 

(বাম থেকে)

লেখক : আবু নোমান মো. জাকির হোসেন

উপপরিচালক, বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, রাজশাহী।

লেখক : আফরোজা ইসলাম শশী

সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট. পিটিআই, শরীয়তপুর।

লেখক : এস এম শাহ জামান

আইন-পরামর্শক ও চেয়ারম্যান, ইক্ষাণ ল অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ফার্ম।

zzamanjakirshashi@gmail.com