ফয়সালসহ দুজন ভারতে গ্রেপ্তার

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় প্রধান আসামি শুটার ফয়সাল করিম মাসুদসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। গত শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল রবিবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থাÑএএনআই, এসটিএফের বরাত দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করে। এসটিএফ তাদের দুই বাংলাদেশি হলেন, রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭), তার বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। অন্যজন আলমগীর হোসেন (৩৪), তিনি ঢাকার বাসিন্দা।

হাদি হত্যা মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, ‘তথ্যটি আমরা যাচাই করছি। নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু করব।’

ভারতীয় ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধ করে দুই ব্যক্তি অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। তারা বনগাঁর সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন এবং সুযোগ বুঝে আবার বাংলাদেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একটি বিশেষ দল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছেন, তারা ওসমান হাদি হত্যাকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। খুনের ঘটনার পর তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। এরপর ভারতের বিভিন্ন স্থানে পরিচয় গোপন করে ঘুরে বেড়ানোর পর অবশেষে বনগাঁয় পৌঁছান। সেখান থেকেই তারা আবার সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার পরিকল্পনা করছিলেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল তাদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ অপরাধী চক্রের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কি না এবং ভারতে তাদের অন্য কোনো আশ্রয়দাতা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছু পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেল থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। তাকে মাথায় গুলি করার পর আততায়ীরা মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। অন্তর্বর্তী সরকার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে । থানা-পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু ডিবির দেওয়া চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে গত ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন মামলার বাদী। আদালত আবেদন গ্রহণ করে মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেয়। সিআইডিতে মামলাটি তদন্তাধীন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে, তদন্ত সংস্থা সিআইডি প্রতিবেদন জমা না দেওয়ায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১১ মার্চ দিন ধার্য করেন।

ডিবির দাখিল করা চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে এবং প্রধান আসামি ফয়সালসহ ছয়জন পলাতক রয়েছেন। চার্জশিটে ১৭ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি ছিলেন ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন ছিলেন দ্বিতীয়।

এ ছাড়া ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। ২৩ ডিসেম্বর আদালত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেয়। সেদিনই ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

এদিকে গতকাল একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও মূল শ্যুটার ফয়সাল ও অভিযুক্ত সহযোগী আলমগীরকে ভারত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দাবি, সম্প্রতি ডিজিএফআই-এর নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ভারত সফর করেন। তিনি এই সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হাদি হত্যা মামলার আসামিসহ সন্ত্রাসীদের আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই দুই আসামিকে আটক করতে সক্ষম হয়। এ ছাড়াও, বাংলাদেশের আহ্বানের প্রেক্ষিতে ভারতে বসে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধেও সাঁড়াশি অভিযান চালাবে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়তা দিয়েছে।