উন্নয়ন, সীমানা দেয়াল বা বাগান নির্মাণের নামে চট্টগ্রামে কাটা পড়ছে শতবর্ষী গাছ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্প্রতি শত বছরের পুরনো গাছ কেটেছে। সর্বশেষ গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ কর্র্তৃপক্ষ প্রায় আড়াই ফুট ব্যাসের একটি শতবর্ষী গাছ কেটে উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করে। গাছ কাটার ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও এসব সংস্থা তা মানেনি। ফলে পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এ নির্বিচার গাছ কাটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
গতকাল দুপুরে নগরীর চট্টেশ্বরী রোডে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্রীনিবাসের সীমানা দেয়ালে প্রায় আড়াই ফুট ব্যাসের একটি শতবর্ষী গাছ কাটা হচ্ছিল। গাছের ডালপালা ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে, যার প্রতিটি ডাল প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ গাছের মতো মোটা। ডাল কাটা প্রায় শেষ, তবে গাছের মূল কাণ্ড তখনো অক্ষত ছিল। গাছ কাটায় নিয়োজিত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে ভবন নির্মাণের জন্য গাছটি কাটা হচ্ছে। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তারা কাজ বন্ধ করে সরে যান।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, গাছ কাটার স্থানে ছাত্রীদের জন্য দুটি আটতলা ভবন নির্মিত হবে, যা ছাত্রীনিবাস হিসেবে ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি বর্তমান ছাত্রীনিবাস ভেঙে ১৮ তলাবিশিষ্ট একটি নতুন ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করা হবে। সীমানা দেয়ালের শতবর্ষী গাছ কাটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছাত্রীনিবাসের প্রবেশপথের গেটের জায়গায় গাছটি অবস্থিত। তাই প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা এটি কাটছে। তবে গাছটি অনেক পুরনো হওয়ায় এটি কাটলে অনেকেরই কষ্ট হবে, এটা স্বাভাবিক। আমি প্রকল্প কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছি, গেটের অবস্থান সামান্য সরিয়ে গাছটি রক্ষা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করতে।’ কিন্তু গাছের ডালপালা তো ইতিমধ্যে কাটা হয়ে গেছে, শুধু মূল কাণ্ড বাকি এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আর যাতে কাটা না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রীনিবাস প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই গাছটি ছিল। তখন এটি সীমানা প্রাচীরের অংশ হিসেবে কাজ করত। সময়ের সঙ্গে গাছটি বেশ প্রশস্ত হয়েছে, তবে এর দুপাশে সীমানা দেয়াল থাকায় গাছটি ঠিকই টিকে ছিল।
পরিবেশবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন, শত বছর আগে গাছটি রেখে সীমানা দেয়াল নির্মাণ সম্ভব হলে এখন কেন তা সম্ভব হবে না? বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি গাছের গুরুত্ব না বোঝে, তবে তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। গেটের অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করলেই এই শতবর্ষী গাছ রক্ষা করা সম্ভব।’
বাগানের নামে রেলওয়ের গাছ কাটা : পলোগ্রাউন্ড মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণে গাছ কাটার কারণে কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ রেলওয়ে একই এলাকায় শতবর্ষী গাছ কেটে বাগান নির্মাণ করছে। গতকাল দুপুরে পলোগ্রাউন্ড মোড়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের পাশে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় পাঁচ-ছয়টি গাছের গোড়া কাটা হয়েছে। মোটা গাছগুলো মাটির সমান করে কাটা হয়েছে এবং গোড়া লুকাতে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গোড়া প্রায় দুই ফুট প্রশস্ত। কাটা গাছগুলো ভবনের পেছনে নারিকেল পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
গাছ কাটার কারণ জানতে রেলওয়ের অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, ‘গাছগুলো জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। তাই কেটে ফেলা হয়েছে। এখানে একটি সুন্দর বাগান করা হবে। যতগুলো গাছ কাটা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি গাছ রোপণ করা হবে।’
শতবর্ষী গাছের সঙ্গে নতুন গাছের তুলনা কি সম্ভব? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভবনের পরিচ্ছন্নতা ও খোলামেলা পরিবেশের জন্য গাছগুলো কাটা হয়েছে।’
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গাছ কাটতে বন বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন এটি মানা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বন বিভাগে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু তারা কোনো উত্তর না দেওয়ায় নিজেরাই কেটে ফেলেছি।’
সিডিএর সীমানা দেয়াল নির্মাণে কাটা পড়েছে গাছ : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও রেলওয়ের পাশাপাশি সিডিএও সীমানা দেয়াল নির্মাণের সময় বেশ কিছু পুরনো গাছ কেটেছে। সিডিএ ভবনের রেপ্লিকা আদলে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় কয়েক মাস আগে তারা এসব গাছ কেটেছে। ভবনের সামনে কয়েকটি ছোট গাছ কাটা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমানা দেয়ালের পাশে তিনটি বড় গাছ কাটা হয়েছে।
বন বিভাগের অনুমোদন নিচ্ছে না কেউ : চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহরের দায়িত্বে থাকা ফরেস্ট রেঞ্জার মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়া জানান, এসব গাছ কাটার ক্ষেত্রে তিনটি সরকারি সংস্থার কেউই বন বিভাগের অনুমোদন নেয়নি। তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি সংস্থাগুলো প্রয়োজনে গাছ কাটতে পারে। তবে আমরা গাছের উচ্চতা ও প্রশস্ততা পরিমাপ করে ঘনফুট হিসাব করে মূল্য নির্ধারণ করি। সেই মূল্যে দরপত্রের মাধ্যমে গাছ বিক্রি করা যায় এবং কাটা গাছের বদলে কতটি গাছ রোপণ করতে হবে, তাও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই তিন সংস্থা কেউই এ নিয়ম মানেনি।’
এদিকে গাছ কাটায় পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করে প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘একটি গাছ শুধু অক্সিজেন সরবরাহ করে না, এটি একটি বাস্তুতন্ত্র। এটি বাতাস, জীবজন্তু এবং আশপাশের পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। শতবর্ষী গাছের প্রভাব কখনোই নতুন গাছের সমান হতে পারে না।’