পারিবারিক পেশার একাল-সেকাল

ঢাকার মিরপুরে বাস করেন মিসেস জাহেদা। প্রতি বছর ঈদের জাকাতের একটা অংশ নির্ধারিত করে রাখেন গ্রামের গরিব অসহায় পরিবারের জন্য। এবার বিশেষ একজনের জন্য বাড়তি টাকা পাঠানোর চিন্তা করছেন। তার নাম আলতা বানু। বয়স ৭০-এর বেশি হবে। কুঁজো হয়ে হেঁটে এখনো পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সময় কাটান। এখন তার সংসার বলতে মাটির একখান ঘরই সম্বল। আলতা বানুর চার ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেমেয়েরা আশপাশে ছোট ছোট ঘর তুলে আলাদা থাকে। নিজেও তার মায়ের ভিটেবাড়িতে জীবন পার করে দিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিয়ে হয়। ঘরজামাই স্বামীর পেশা ছিল মাঝি। বিয়ের ২৫ বছর পরই স্বামী মারা যান। আলতা বানুর মা ছিলেন একজন আলোচিত ধাত্রী। সুনামের সঙ্গে অজপাড়াগাঁয়ে মানবসেবা করেছেন ধাত্রীসেবা দিয়ে। ছোটবেলায় থেকেই ছিলেন পরোপকারী। যেখানে মানুষের বিপদের কথা শুনতেন সেখানেই ছুটে চলতেন তিনি। আর সেই উপকারের দিক ধরে রেখে প্রয় ৩৫ বছর ধরে ধাত্রীর কাজ করেছেন। অনুমান করে জানালেন, প্রায় ৫০০ শিশুর নাড়ি কেটেছেন।

ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গে আশপাশ দশ গ্রামে ধাত্রীসেবার জন্য ছুটেছেন আলতা বানুও। মায়ের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজেও একজন আলোচিত ধাত্রী হয়ে ওঠেন। হাতযশ ভালো থাকায় সবাই এক নামেই তাকে চিনত। মা-মেয়ের ধাত্রীসেবায় তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। দুয়েকটা জায়গায় সেবা দিতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলেও তাদের দোষারোপ করেনি। কারণ, তাদের আন্তরিকতা এবং অভিজ্ঞতাকে সবাই প্রশংসা করেছে। যেকোনো বাড়ির বউঝি সন্তানসম্ভবা হলেই তাদের ডাক পড়ত। কখনো মা, কখনো মেয়ে গিয়ে নানান পরামর্শ দিয়ে আসতেন, প্রসূতির হাঁটাচলা-খাওয়াদাওয়া। সকাল-সন্ধ্যায় ঘরের বাইরে না যেতে সতর্ক করতেন।

আলতা বানুর মা মারা যাওয়ার পর নিজেই ধাত্রীসেবা দিয়েছেন। সন্তান প্রসবের খবর শুনে পা বাড়াতেন পাড়া-মহল্লার এ-বাড়ি ও-বাড়ি। অল্প পারিশ্রমিকে পেলেও ছুটে চলেন নদীর এপার থেকে ওপারে এবং ইউনিয়ন থেকে আরেক ইউনিয়নে। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। নারীদের কোনো সমস্যার কথা শুনলে ছুটে গেছেন সেখানে। স্থানীয়রা তাকে বড় কদর করে ডেকে নিয়েছেন। ধাত্রীসেবার জন্য বেশি দূরে গেলে এক-দুদিন সেখানেই রয়ে যেতেন। বাড়ি ফিরতেন নতুন একটা শাড়ি আর অল্প কিছু টাকা নিয়ে। কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পেতেন না, যা পেতেন তা একরকম বখশিশের মতো। তাতেই তাদের পরিবার খুশি। এ স্বল্প টাকা দিয়ে সন্তান লালনপালন করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। নতুন শিশুর আগমনকে প্রাধান্য দিয়ে সেবা দিয়েছেন জীবনের বেশিরভাগ সময়টা।

আলতা বানুর এখন আর ব্যস্ততা নেই। আধুনিক যুগে উন্নত পরিষেবায় তারা পিছিয়ে। এমন একটা সময় ছিল দিনরাত মিলে পাঁচ-ছয়টি ডেলিভারির কাজ করছেন। কিন্তু এখন আশপাশে দুয়েক বাড়িতে ঘর-গৃহস্থালির কাজ করে সংসার চালান। পাড়া-মহল্লার সবাই এখনো আলতার খবর রাখেন। অনেকেই তাকে স্মরণ করে ঈদ বা যেকোনো পার্বণে টাকা ও শাড়ি উপহার দেন। এতেই আলতা বানুর গাল খুশিতে চিকচিক করে।