তেলের সর্বোচ্চ দামে বড় পতন বন্ড বাজারে

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে সোমবার (৯ মার্চ) বিশ্ববাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র অস্থিরতা। এতে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে। পাশাপাশি সরকারি বন্ডের বাজারেও বড় পতন দেখা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রভাবে সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক সময়ে ২৮ শতাংশ বেড়ে যায়। এশিয়ার বাজারে লেনদেনের এক পর্যায়ে এর দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৯ ডলারে উঠে আসে। ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর এটি সর্বোচ্চ। তবে পরে কিছুটা কমে তা ১০৫ ডলারে নেমে আসে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকটের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা দিতে পারে। উল্লেখ্য, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়।

এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে মনোনীত করার খবরও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের কট্টরপন্থি শক্তি এখনও দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। এই খবরও বাজারের অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সে কারণেই ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো চলতি বছর সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। লন্ডনের রাবোব্যাংকের সিনিয়র রেট স্ট্র্যাটেজিস্ট লিন গ্রাহাম-টেলর বলেছেন, আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই আতঙ্কিত করার মতো। বিনিয়োগকারীরা এখন জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। আর এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার বেশি রাখতে হতে পারে, এমনকি বাড়াতেও হতে পারে।

বন্ড বাজারে বড় পতন

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই শঙ্কার প্রভাব পড়েছে বন্ডের বাজারেও। সোমবার সরকারি বন্ডের দাম কমে যাওয়ায় তাদের ইল্ড বা সুদের হার বেড়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ধারণা করছেন, চলতি বছর শেষ নাগাদ ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্তত দুবার সুদের হার বাড়াতে পারে। কয়েক মাস আগেও বাজারে ধারণা ছিল, সুদের হার কমানো হতে পারে।

একই অবস্থা ব্রিটেনেও। ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার বাড়াতে পারে-এমন সম্ভাবনা এখন প্রায় ৭০ শতাংশ ধরা হচ্ছে। অথচ এই যুদ্ধ শুরুর আগে বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, চলতি মাসেই সুদের হার কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভ এখনও শরতের দিকে সুদের হার কমাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে সেই প্রত্যাশাও আগের চেয়ে কমে গেছে।

ঋণের খরচ বাড়ার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে ব্রিটেনে। দেশটির দুই বছরের সরকারি বন্ডের ইল্ড এক সময়ে বেড়ে ৪ দশমিক ২৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে তা কিছুটা কমে ৪ দশমিক ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। জার্মানিতেও বন্ডের ইল্ড বেড়ে ২ দশমিক ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় ইউরোপের বাজার এই ধাক্কায় বেশি নড়বড়ে হয়েছে। গত সপ্তাহেই ইউরোপীয় বন্ডের ইল্ড গড়ে প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। এর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক হওয়ায় সেখানে দুই বছরের বন্ডের ইল্ড তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে।