বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে ঝড়?

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস বারবার আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করেছে ভূগোল কেবল মানচিত্রের রেখা নয়, অনেক সময় সেটিই রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের নীরব নিয়ামক। মানচিত্রের একটি সরু জলরেখা কখনো কখনো সাম্রাজ্য গঠন করে, আবার কখনো সাম্রাজ্য ভেঙে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ। এই প্রণালীকে ঘিরে যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাত সরাসরি সামরিক রূপ নিেেছ, তখন তা কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়; এটি   বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর সংকেত। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাতের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত উঠে আসছে। ইরানের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি অঞ্চল জুড়ে মার্কিন উপস্থিতি লক্ষ করে আঘাত হানার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। একইভাবে ইসরায়েলের দিকে ইরানের ব্যাপক মিসাইল নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে বহুমাত্রিক যুদ্ধে রূপ দিয়েছে। ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বহু বছর দেখা যায়নি।

উত্তেজনার কেন্দ্রে যখন হরমুজ প্রণালী, তখন এর তাৎপর্য বোঝা জরুরি। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির একটি বড় অংশ এই প্রণালী অতিক্রম করে। ফলে এটি কার্যত বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের মহাসড়ক। ইরান যদি কৌশলগতভাবে এই প্রণালীতে সব দেশের জন্য বাধা সৃষ্টি করে বা বন্ধ ঘোষণা করে, তাহলে তা জ্বালানি সরবরাহে গভীর প্রভাব ফেলবে। ইতিহাসে সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালীর গুরুত্ব যেমন ছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালীও একটি অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। যুদ্ধের এ পর্যায়ে যখন সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার খবর আসে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালানি বাজার কেবল সরবরাহ ও চাহিদার হিসাবে চলে না; এটি প্রত্যাশা, ঝুঁকি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ওপরও নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়, কারণ যুদ্ধাঞ্চল অতিক্রম করা জাহাজের ঝুঁকি বাড়ে। শিপিং খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এলএনজি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, কারণ তখন ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতায় নামে।

মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যেই বহু দেশে উদ্বেগের বিষয়। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হলে, বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বলা হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছে, তারাও ব্যাপক চাপে পড়তে পারে। চীন ও ভারত, বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশদুটি এই সংকটে বড় ধাক্কা খেতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তাদের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি দ্বিমুখী। একদিকে উচ্চ তেলের দাম তাদের রাজস্ব বাড়তে পারে, অন্যদিকে যুদ্ধ ও অবকাঠামো ক্ষতির ঝুঁকি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বিপর্যস্ত করতে পারে এবং বিনিয়োাগ স্থগিত হতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।  বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই সংকট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। সরকারকে ভর্তুকি বৃদ্ধি করতে হলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। বিদু্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানির প্রধান খাত, তা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করবে। মুনাফার হার বৃদ্ধি পেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও চাকরির স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। তবে তেল রাজস্ব বৃদ্ধি পেলে কিছু দেশে অবকাঠামো প্রকল্প বাড়তে পারে, যা শ্রমবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি রূপান্তরের প্রশ্ন। উচ্চ তেলের দাম নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ খাতে আগ্রহ বাড়তে পারে। বহু দেশ কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি ও বিকল্প রুট উন্নয়নে মনোযোগ দিতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে না। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই সংকট নতুন জোট ও সমীকরণ তৈরি করতে পারে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।  বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ এখন নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এবং জ্বালানি নীতির পুনর্বিন্যাসের ওপর। যদি দ্রুত উত্তেজনা প্রশমিত না হয়, তবে এর প্রভাব শিল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল অর্থনীতি পর্যন্ত সবখানে অনুভূত হবে। হরমুজের জলরেখা তাই আজ কেবল সমুদ্রের স্রোত নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের স্রোতধারা।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

sultanmh17@gmail.com