রপ্তানিতে ধস

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণ শুরু হয়েছে ইরানের ওপর। এই ১০ দিন বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় কোনোরকম পণ্যবাহী জাহাজই ওই নৌপথ দিয়ে চলাচল করতে পারেনি। সম্প্রতি এশিয়ামুখী তেলবাহী  ট্যাংকার চলাচল উন্মুক্ত করেছে ইরান। ইউরোপ ও আমেরিকান কোনো জাহাজ এলেই আক্রমণে যাবে তারা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিপণ্যের জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। উল্লেখ্য, আমাদের কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের বড় বাজার তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠায় প্রাণ, স্কয়ারসহ অনেক কোম্পানি। যুদ্ধের প্রথম দিন স্কয়ারের ৯ কনটেইনার আটকে যায় চট্টগ্রাম বন্দরে। সেখানে আধা মিলিয়ন ডলারের পণ্য ছিল। আর প্রাণের ২০০ কনটেইনার আটকা পড়ে আছে সেখানে। ওই কনটেইনারগুলোর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও দুবাই। এর ফলে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানিতে ১০ দিনেই ধস নেমেছে বলে ধারণা করা যায়। আবার জ্বালানি ও সার আসতে পারছে না হরমুজ প্রণালি হয়ে, সে-কারণে, দেশের প্রায় সব সেক্টরে সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে এতটাই শঙ্কা যে, মধ্যরাত পর্যন্ত তেলের পাম্পে গাড়ির লম্বা লাইন পড়ছে। এতে অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগসহ নিত্যদিনের কর্মগতি। যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত এই অবনতিশীল পরিস্থিতির অবসান হবে না। যুক্তরাষ্ট্র অপেক্ষা করছে, কখন ইরানের অস্ত্রের মজুদ শেষ হবে এই আশায়। সেই সময় ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করার জন্য বিশেষ বাহিনী পাঠাবেন। তার লক্ষ্য ইরানের ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়া। তাতে ইরান আর পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে পারবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশেরই কেবল নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক দুর্দিন নেমে আসবে। ইতিমধ্যে যুদ্ধে ইরানের পক্ষে সায় জানাচ্ছে রাশিয়া ও চীন। ফলে যুদ্ধের রূপ ভয়াবহ হবে। শীতল যুদ্ধের কাল শেষে আমরা ধারণা করেছিলাম যে, নতুন চিন্তা ও মানবিক পৃথিবীর বিষয়ই প্রাধান্য পাবে। কিন্তু তা হয়নি। এখন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, আমেরিকা যেন এক অন্তহীন ধর্মযুদ্ধ চালাচ্ছে। আর সভ্যতা ধ্বংসের ধর্মযুদ্ধের উদগ্র প্রেরণাদাতা ছিলেন হান্টিংটন। মানুষ হত্যা করো, বিশেষ করে ইসলামি সভ্যতা ধসিয়ে দাও, তাদের সম্পদ দখল করো, তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনো যাতে তারা মাথা নত করে থাকে। এই হিংসাত্মক পরিস্থিতির জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পই উপযুক্ত। গাজায় ৮০ হাজার মানুষ হত্যা করার পরও, ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ থামেনি। তেহরানে হামলা চালিয়ে হত্যা করছে সেখানকার মানুষ। এশিয়া মহাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ বিধায় ট্রাম্পের চোখ এদিকেই। তার টার্গেটে চীন, ভারত আর রাশিয়া রয়েছে। এরা পরাশক্তির অধিকারী হলেও, পরস্পরের মধ্যে নানা অমতের সুযোগে, আমেরিকা তার লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করছে। ঠিক বিপরীতে গড়ে উঠতে যাচ্ছে নিউ ইকোনমিক অর্ডার, যার নেতৃত্বে থাকবে চীন। ডলারের পতন না ঘটা পর্যন্ত, ট্রাম্পের হত্যাযজ্ঞ ও সম্পদ লুটের খাই থামবে না।

কিন্তু ততদিনে আমাদের কী দশা হবে, বলা কঠিন। আপাতত রপ্তানি যে পণ্যেরই হোক, জনশক্তি রপ্তানি হবে অন্যতম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্সের গতি বাড়লে, হয়তো উদীয়মান অর্থনীতিকে একটি স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে সরকার। তবে, সামরিক সংঘাত যে গোটা বিশ্বের সংকটকে ঘনীভূত করে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইরানের যুদ্ধ চালানের সংকল্প দেখে মনে হয়, সহসা যুক্তরাষ্ট্রকেও থামানো যাবে না। আমরা গভীর সংঘাতের জালে আটকা পড়েছি বলে মনে হয়।