যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির তেল বাজার

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চল- একদিকে যেমন যুদ্ধের বিভীষিকায় পর্যুদস্ত, অন্যদিকে এই অস্থিতিশীলতার প্রভাবে টালমাটাল তেলের বাজার। চলমান এই সংঘাত ক্রমশ তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গতকাল সোমবার তেলের দাম একপর্যায়ে প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। পরে কিছুটা কমলেও বাজারে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে লন্ডনের এফটিএসই ১০০ শেয়ার সূচক ১.৫ শতাংশ পড়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে আলোচনা করতে গতকাল জরুরি বৈঠকে বসেছিল জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো। যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র‌্যাচেল রিভসসহ বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এই বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠকে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় জোর দেওয়া হয়। মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের তারতম্য দেখা যাচ্ছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় ওই প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির উত্তরে রয়েছে ইরান; আর এই পথ দিয়েই সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জি-৭-এর এই বৈঠকে জরুরি তেলের মজুদ বা রিজার্ভ থেকে তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)-এর সমন্বয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আর তেমনটা হলে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর এটিই হবে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের বিঘেœর মুখে পড়ায় বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্বের তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সরু জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

গত রবিবার ইরান ঘোষণা করেছে যে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেবেন। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হলো যে, সংঘাতের এক সপ্তাহ পার হলেও ইরানের কঠোরপন্থিরাই দেশটির ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরান জুড়ে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা তেল ডিপোসহ বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। সোমবার এশিয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম একপর্যায়ে ২৫ শতাংশ বেড়ে ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছায়, পরে তা ১০৭ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড অয়েলের দামও একই রকম অস্থিরতা দেখেছে এবং এটি ১০৪ ডলারের আশপাশে লেনদেন হয়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও অনেকটা বেড়েছে। সোমবার লেনদেন শুরুর পর যুক্তরাজ্যের গ্যাসের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি থার্ম ১৭১ পেন্স পর্যন্ত ওঠে, পরে তা ১৫৬ পেন্সের আশপাশে স্থির হয়। ইউরোপের শেয়ার বাজারগুলোও পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু করে। জার্মানির ড্যাক্স এবং ফ্রান্সের ক্যাক ৪০ সূচক প্রায় ২.৫ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচকের প্রায় সব শেয়ারের দরপতন হয়েছে, ব্যতিক্রম ছিল কেবল তেল জায়ান্ট বিপি ও শেল। এর আগে এশিয়ার বাজারে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫.২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৬ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আতঙ্কিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য ‘সার্কিট ব্রেকার’ ব্যবহার করে লেনদেন স্থগিত রাখতে হয়েছিল। মোটরিস্ট গ্রুপ ‘এএএ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত গ্যাসোলিনের গড় দাম ১১ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালন ৩.৩২ ডলারে পৌঁছেছে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স-এর আদনান মাজারেই বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোয় উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সংকেত পাওয়ায় তেলের দামের এই লাফ প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে এই লড়াই দ্রুত শেষ হওয়ার নয়। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি বারবার এড়িয়ে গেছেন।

গত রবিবার তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকির বিনাশ ঘটার পর তেলের দাম দ্রুতই কমে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি সামান্য মূল্য। শুধু বোকারাই এর উল্টোটা ভাববে! যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়; ইসরায়েল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানছে।

ইসরায়েলের প্রতি বিরক্ত যুক্তরাষ্ট্র : গত শনিবার ইরানের ৩০টি জ্বালানি ডিপোতে ইসরায়েলের হামলায় ‘বিস্মিত ও বিরক্ত’ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলছে, হামলার বিষয় আগেই জানানো হলেও, এর পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল। ইসরায়েল বলেছিল, ওই স্থাপনাগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আট দিনের মাথায় দুই মিত্র দেশের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এমনকি, ওয়াশিংটনের তরফ থেকে তেল আবিবে ‘হোয়াট দ্য ফা.. বা ডব্লিউটিএফ’ বার্তা পাঠানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

খবরে বলা হয়েছে, সাধারণ ইরানিদের ব্যবহৃত অবকাঠামোতে ইসরায়েলি হামলা কৌশলগতভাবে উল্টো ফল দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইরানের সমাজ শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে এবং তেলের দামও বাড়তে পারে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, হামলার ব্যাপ্তি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিস্মিত হয়েছে। ‘আমরা মনে করি না এটি ভালো কোনো সিদ্ধান্ত ছিল।’

এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ছিল মূলত ‘ডব্লিউটিএফ।’ এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউজ বা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। গত রবিবারও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তেহরান ও এর আশপাশে ৫টি তেলের ডিপো ও একটি পরিশোধনাগারে হামলা চালানোর পর ইরানের রাজধানীর বিভিন্ন অংশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ছবি-ভিডিওতে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণহীন আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং বিষাক্ত গাঢ় কালো ধোঁয়া আশপাশের সবকিছুকে ঢেকে দিচ্ছে। একটি তেলের ডিপো থেকে লিক হওয়া তেলে আগুন ধরে যাওয়ার পর সড়কে ‘আগুনের নদী’ দেখতে পাওয়ার কথা জানান স্থানীয়রা।

হামলার পর তেল ও ধুলোবালিমিশ্রিত কালো বৃষ্টি লোকজনের ওপর পড়ে; কর্র্তৃপক্ষ ‘এসিড বৃষ্টির’ খবরে সবাইকে চার দেয়ালের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেয়। ইসরায়েলের এ হামলার মানবিক ও পরিবেশগত মূল্য যেমন অনেক, তেমনি এর কারণে কৌশলগত কিছু মূল্য চুকানো লাগতে পারে বলেও সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। তাদের ভাষায়, এ হামলা যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে; ইরান যদি এর পাল্টায় আশপাশের সব দেশের জ্বালানি স্থাপনায় লাগাতার হামলা শুরু করে তাহলে পরিস্থিতি সামলানো মুশকিল হয়ে পড়বে।