যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কঠোর বার্তা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর ইরানের সঙ্গে দেশ দুটির যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এমন বার্তা দিলেন, তখন ইরান তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া দুই দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার ও নতুন রণকৌশল নির্ধারণে মনোযোগী। অনেকটা এ কৌশলের অংশ হিসেবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে মোজতবা খামেনিকে।

ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ মনোনীত এই নেতা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজতবার এ উত্থান তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি কঠোর বার্তা। আর তা হলো, তারা পিছু হটবে না এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

মোজতবা খামেনির এ নিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছিলেন, ‘খামেনির ছেলে আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’ কিন্তু ইরান সেই বক্তব্য উপেক্ষা করে দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পদে আলি খামেনির পুত্রকেই বসিয়েছে।

মোজতবা দীর্ঘকাল ধরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তার এ নিয়োগ প্রমাণ করে যে, ইরানে শাসকগোষ্ঠী বদলানো ও দেশটিকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার যে চেষ্টা ট্রাম্প চালিয়েছিলেন, তা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হলো এবং সংস্কার বা মধ্যপন্থিরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেন।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসী যে, মোজতবা খামেনি তার বাবার কাজ ‘মর্যাদার সঙ্গে’ এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং কঠিন পরিস্থিতির মুখেও ইরানি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখবেন। এ সময় পুতিন তেহরানের প্রতি রাশিয়ার ‘অবিচল সমর্থন’ এবং ‘সংহতির’ বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন।

চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ওয়াকিল বলেন, ‘মোজতবার উত্থান একই পুরনো কৌশলের ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয় দেশে দমনপীড়ন আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিরোধ।’

নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য জানিয়েছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) ও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। আইআরজিসি বলেছে, ‘আমরা সব আদেশ মেনে চলব এবং তা বাস্তবায়নে সদা প্রস্তুত থাকব।’ আইআরজিসি আরও বলেছে খামেনির এ নির্বাচন সবার কাছে প্রমাণ করেছে, ইসলামি ব্যবস্থার অগ্রযাত্রা থেমে থাকে না এবং এই বিপ্লব ও ইসলামি ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী মোজতবা খামেনিকে ‘ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানবান, ধর্মপ্রাণ ও বিচক্ষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা আরও বলেছে, খামেনিকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরিষদ বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জানাতে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সমাবেশ করেছে ইরানিরা।

মোজতবা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় ছেলে। তার বয়স ৫৬ বছর। তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিলেন যখন তার ব্যক্তিগত জীবনও যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত।

মোজতবা খামেনি এতদিন জনসমক্ষের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। তার সম্পর্কে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি বলেন, মোজতবা খামেনি ‘নেতৃত্বের পাঠশালায়’ বড় হয়েছেন। বাবার শিক্ষাই তাকে দেশ পরিচালনায় সহায়তা করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে বাবা আলি খামেনির পাশাপাশি তিনি মা, বোন, স্ত্রী ও এক সন্তানকে হারিয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই প্রথম বংশগত ক্ষমতার হস্তান্তর। বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং পরবর্তী নেতা আলি খামেনি, উভয়ই বংশ পরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান বিশ্বের কাছে বার্তা দিতে চাইছে যে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের শাসনব্যবস্থা সচল।

ইরানকে বিভক্ত করার চেষ্টা : ইরানের তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।

এদিকে, কয়েক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে কথা বলে আসা রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইরান সরকারকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সরকার ‘উৎখাত’ করার জন্য অর্থ ব্যয় করাটা সার্থক হবে। গত রবিবার ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘যখন এ শাসনের পতন ঘটবে, তখন আমরা এক নতুন মধ্যপ্রাচ্য পেতে যাচ্ছি এবং আমরা বিপুল অর্থ আয় করতে যাচ্ছি।’

মধ্যস্থতায় চীনা দূত রিয়াদে : এদিকে দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো চলতে থাকা এ যুদ্ধে মধ্যস্থতা করতে নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত ঝাই জুনকে পাঠিয়েছে চীন। তিনি এখন সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থান করছেন।

হামলা পাল্টা-হামলা চলছে : গতকাল সোমবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কেঁপেছে ইরানের প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো। বাহরাইনের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। বাহরাইনের রাজধানীর কাছে ইরানের ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ডও একটি ড্রোন ভূপাতিতের কথা জানিয়েছে। ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের উদ্ধারকারী সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম (এমডিএ) জানিয়েছে, মধ্যাঞ্চলের দুটি পৃথক স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ইউরোপমুখী ক্ষেপণাস্ত্র আটকাল তুরস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে এ সংঘাত গতকাল এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ন্যাটোর সদস্য-রাষ্ট্র তুরস্কের আকাশসীমায় একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করার পর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।

আঙ্কারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের সুরক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে তারা কোনো দ্বিধা করবে না।

ইরানের অস্বীকার : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তার দেশে তুরস্ক, সাইপ্রাস ও আজারবাইজানের ওপর হামলা চালায়নি। তিনি বলেন, গত সপ্তাহেও এমন হামলার খবর এসেছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, এ ধরনের ঘটনা ইরান ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরির একটি অপচেষ্টা।