আইডি ‘হ্যাক’ করে দরপত্র মূল্যায়ন!

যেসব দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ এনে বরখাস্ত করা হয়েছে, সেসব দরপত্র আরও তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমান। সংস্থাটির প্রশাসকের কাছে দেওয়া এক আবেদনে তিনি তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে টেন্ডার মূল্যান করা হয়েছে বলে দাবি করেন। এর আগে গত রবিবার বিভিন্ন অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

লিখিত আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত হওয়া অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান এর আগে প্রধান প্রকৌশলী মঈন উদ্দিনের দায়িত্বের সময়ও আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে ৩৩টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করেন। বিভিন্ন দরপত্রের প্রক্রিয়ায় নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী ও নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে ‘ওয়ার্ক ফ্লো’ তৈরি করেছেন। তাই এ ঘটনা আরও তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন আরিফুর রহমান।

লিখিত আবেদন অনুযায়ী, ডিএনসিসির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় গত ১৩ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আরিফুর রহমান প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময় তাকে বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভাগের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ করতে হয়েছে। এ কাজে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীর ল্যাপটপে প্রধান প্রকৌশলীর আইডিতে ঢুকে কাজ করেছিলেন।

যে ১৫টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো উল্লেখ করে আরিফুর রহমান বলেন, দরপত্রগুলোর সুপারিশ তার দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি বিকেল ৫টার পর থেকে পরদিন ২৯ জানুয়ারি রাত, বিকেল ও সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন সময় খুব দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে। ওই সময় পর্যন্ত ই-জিপির সিস্টেমে তার নাম কীভাবে থেকে গেছে, তিনি সেটা জানেন না।

একটি দরপত্রের সুপারিশও করেননি দাবি করে আরিফুর রহমান বলেন, ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান (গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত হয়েছেন) বিভিন্ন দরপত্রের প্রক্রিয়ায় নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী ও নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে‘ওয়ার্ক ফ্লো’ তৈরি করেছেন। মাঝে মূল্যায়নের ধাপটিতে মিজানুর তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে মূল্যায়নের সুপারিশগুলো করেছেন।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার আইডি ব্যবহার করে যে টেন্ডারগুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে, এর বেশির ভাগই রাতে। তাও তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। আমি ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলাম। কিন্তু টেন্ডারগুলো মূল্যায়ন করেছে ২৯ জানুয়ারি গভীর রাতে, কোনোটা রাত ১২টা, ২টা, ৩টা... এমন সময়। আইসিটি বিভাগ তখনো টেন্ডার আইডি ট্রান্সফার করেনি, এতে তো আমার দায় থাকার কথা না।’ তিনি বলেন, ‘আমি লিখিতভাবে সব বিষয় জানিয়েছি। আশা করি, প্রশাসক এ বিষয়ে তদন্ত করবেন। তদন্ত করলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।’

এর আগে গত রবিবার ডিএনসিসির সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই আদেশে বলা হয়েছে, ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ-২০২৫’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬’ এবং ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫’ লঙ্ঘন করে তিনি কেনাকাটা করেছেন। তাই ডিএনসিসি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ, অদক্ষতা, দুর্নীতিপরায়ণ ও তহবিল তছরুপ বা প্রতারণার দায়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমানকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন।

ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নমূলককাজের জন্য সাধারণত বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীরা দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন। ই-জিপি পদ্ধতিতে করা ওই দরপত্র প্রক্রিয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী একটি ওয়ার্ক ফ্লো তৈরি করেন। যেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে হন ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ (পিই)। আর দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) নেতৃত্বে থাকেন প্রধান প্রকৌশলী। সবশেষ ধাপে সংস্থার প্রধান বা হোপ দরপত্রের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান নিজেই দরপত্র আহ্বান করে এবং নিজেই হোপ হয়ে ৪৮টি দরপত্রের অনুমোদন নিজে নিজেই দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১৫টি দরপত্রের মূল্যায়নের সুপারিশ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমানের প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সময় হয়েছে। যেটাকে আরিফুর রহমান দাবি করেছেন আইডি হ্যাক করে করা হয়েছে। তিনি সেই দরপত্রগুলোর আরও তদন্ত চেয়েছেন।