সৌদি আরবে হামলায় নিহত ২

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটে হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। এ অঞ্চলে নিরীহ বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি অব্যাহত থাকাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে সরকার। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া এবং টাঙ্গাইলের সখীপুরের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন। আহতরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এদিকে নিহত মোশাররফ ও বাচ্চু মিয়ার বাড়িতে চলছে মাতম। পরিবারের স্বপ্নপূরণে প্রবাসে গিয়ে যারা ছিলেন, তাদের এমন মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনরা।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নিয়েছেন। নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা সৌদি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

বাংলাদেশ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় এমন সব ধরনের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি প্রশমনে এবং প্রাণহানি রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিবৃতিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং চলমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

দিশেহারা বাচ্চু মিয়ার পরিবার : কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবের আল-খার্জে হামলায় নিহতদের একজন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ফেকামারা গ্রামের মো. বাচ্চু মিয়া (৩৫)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন এবং পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাকে হারিয়ে পুরো পরিবারটি এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তিনি স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রেখে গেছেন।

শোকাহত পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বাচ্চু মিয়ার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে এতিম হয়ে যাওয়া সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তারও আবেদন জানিয়েছেন তারা।

কান্না থামছে না মোশাররফের স্বজনদের : বাড়ির উঠানে পা রাখতেই কানে ভেসে আসে বুকফাটা আর্তনাদ। স্ত্রী কবরী আক্তার বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন, চিৎকার করে বলছেন, ‘আমাকে ফেলে তুমি কোথায় চলে গেলে?’ তার এ কান্নায় চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। পাশে বৃদ্ধা মা জহুরা বেগম ছেলের নাম ধরে ডাকছেন, কখনো জ্ঞান হারাচ্ছেন, কখনো চোখ মেলে বলছেন, ‘একবার আমার সামনে আয় বাবা।’ বাবা সুজাত আলী নীরবে কাঁদছেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে শুধু বলছেন, ‘আমার ছেলেকে একবার দেখতে চাই।’

সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডের আবাসিক ভবনে হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সখীপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্তনখোলা গ্রামের মোশাররফ হোসেন (৩৮)। বিস্ফোরণের পরপরই তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৩টার দিকে পরিবার নিশ্চিত হয়। এরপর থেকে বাড়িতে শুধু কান্না আর মানুষের ভিড়।

মোশাররফের স্ত্রী কবরী আক্তার বিলাপ করে বলেন, ‘এখন এই দুই সন্তান নিয়ে আমি কীভাবে চলব? আমাদের এখন কে দেখবে?’

বাবা সুজাত আলী বলেন, ‘আমার ছেলেকে তো আর দেখতে পাব না। অন্তত তার লাশটা দেশে ফেরত চাই, যেন শেষবার দেখতে পারি।’ তিনি দ্রুত লাশ দেশে আনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।

দেশে এলো আমিরাতে নিহত আহমেদ আলীর মরদেহ: মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার প্রবাসী সালেহ উদ্দিন ওরফে আহমেদ আলীর মরদেহ অবশেষে নিজ বাড়িতে পৌঁছেছে। প্রিয়জনের মরদেহ ঘরে ফিরতেই স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। গতকাল বেলা ৩টার দিকে উপজেলার গাজিটেকা গ্রামে তার বাড়িতে মরদেহ পৌঁছালে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় জমান। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনকে ফিরে পেলেও সেটি নিথর দেহ এ দৃশ্য দেখে শোকের মাতমে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। পরে বিকেল ৫টায় জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আলী আহমেদ নিহত হন।