ইরানের নেতৃত্বের যে নামটি এখন বহুল আলোচিত , তিনি হলেন ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি। কিন্তু কে এই মোজতবা খামেনি? কতটা প্রস্তুত তিনি এমন এক সময়ে দেশের নেতৃত্ব নিতে, যখন পাঁচ দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা?
চলমান যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর তিনি হলেন দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা। তার এই উত্থানকে অনেকে দেখছেন ধারাবাহিকতা ও প্রভাবের ফল হিসেবে।
মোজতবা খামেনিকে অনেকেই তার বাবার রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখেন। দীর্ঘদিন তিনি বাবার ছায়ায় কাজ করেছেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কিংবা বাইরের হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে—সেসব ক্ষেত্রেও তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে। কিশোর বয়সেই এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কোমে পড়াশোনা করেন।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব রক্ষা ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গঠিত আইআরজিসি আজ ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে অর্থনীতির বড় অংশ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাই বর্তমানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখছেন, এবং মোজতবা খামেনি তাদের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন।
তবে তার সামনে থাকা যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, নিজের ট্র্যাজেডির সঙ্গেও জড়িত। ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন তার বাবা ছাড়াও মা মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ, স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল এবং তাদের এক ছেলে। সেই ঘটনার পর এই সংঘাত তার জন্য আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে।
তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর জন্যও ব্যক্তিগত বিষয়, যিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে তিনি তার নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কাউকেই সহজে মেনে নেন না। ট্রাম্প একাধিকবার ঘোষণা করেছিলেন যে আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির কট্টরপন্থী ছেলে কোনও গ্রহণযোগ্য নেতা নয় এবং সতর্ক করেছেন যে মোজতবা খামেনি 'দীর্ঘ সময় টিকবেন না।'
মোজতবা খামেনি হয়তো এখনও কিছু সময়ের জন্য ছায়ায় থেকেই কাজ করবেন। যা তাকে নিয়ে রহস্য আরও বাড়িয়ে দেবে।
তার কোনো সরকারি ভাষণ নেই, তিনি খুব কমই জনসমক্ষে দেখা গিয়েছেন, এবং কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদও কখনো ধারণ করেননি। তার ছবি কখনো তার বাবার সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা প্রতিকৃতির পাশে দেখা যায়নি।
প্রয়াত আয়াতোল্লাহ তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বাদ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল, যাতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত হওয়া রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকারী ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত না হয়। অধিকাংশ ইরানি তার কণ্ঠস্বরও কখনও শুনেনি। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—মোজতবা খামেনি কি ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে স্থিতিশীল রাখতে পারবেন, নাকি তার নেতৃত্বেই দেশ নতুন এক অনিশ্চয়তার পথে এগোবে?