টিসিবি পণ্য বিতরণ পদ্ধতিতে স্বস্তি?

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিত্যপণ্যের দাম সহনশীল রাখতে এবং নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের মধ্যে স্বস্তি দিতে, সরকারের উদ্যোগে কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ শুরু থেকেই চলছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এ দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে অভিশাপ হলো, মূল্যস্ফীতি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সব শ্রেণির মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি এক ধরনের করের মতো। সাধারণত করব্যবস্থা বিত্তশালীদের ওপর আরোপ করা হলেও, মূল্যস্ফীতি সবার ওপর একই ধরনের প্রভাব ফেলে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের বেশি। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশে। এ কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়। এটি সাধারণত তখনই করা হয়, যখন দেশের অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা থাকে।

‘বাংলাদেশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে, ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব বিডায় নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ কম। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাবের ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কয়েক গুণ হ্রাস পেয়েছে। তাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে ঊর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্যের তুলনায় খানিকটা কম দামে তেল, ডাল, চিনি এবং ছোলা খেজুর বিক্রি হচ্ছে। তবে এবার আরও বিক্রি হচ্ছে ডিম, দুধ ও মাংস।

নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট বিবেচনায় টিসিবির পক্ষ থেকে ট্রাকের মাধ্যমে এসব পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন পরিমাণে পাঁচটি পণ্য ৫৯০ টাকায় প্যাকেজ হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে ২ লিটার সয়াবিন তেল ২০০ টাকা, এক কেজি মসুর ডাল ১২০ টাকা, ১ কেজি চিনি ৭০ টাকা, ২ কেজি ছোলা ১২০ টাকা  এবং আধা কেজি খেজুর ৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়াও রোজা উপলক্ষে সুলভ মূল্যে অর্থাৎ ৬৫০ টাকায় এক কেজি গরুর মাংস বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। রাজধানীর ২৫টি স্থানে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মাংসের পাশাপাশি ডিম দুধও বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ডিম ৮ টাকা বা ৯৬ টাকা ডজন ও প্রতি লিটার দুধ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ২৫ রমজান পর্যন্ত মোট ২৬ দিন সুলভমূল্যে মাংস, ডিম দুধ বিক্রি চলবে। একজন ক্রেতা এক কেজি গরুর মাংস, একটি মুরগি, এক লিটার দুধ এবং এক-দুই ডজন ডিম কিনতে পারছেন।

এসব পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের পেছনে ছুটছে স্বল্প আয়ের মানুষ। চাহিদার তুলনায় ট্রাকে পণ্য খুবই কম থাকে বলে, ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে স্বল্প আয়ের মানুষের ভিড় এতটাই বেশি যে, কার আগে কে পণ্য কিনতে পারবে সে জন্য মানুষের বিশাল লাইন দেখা যায়। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলার কারণে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। পণ্য দেওয়ার পয়েন্টগুলো আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে টিসিবির পণ্য সংগ্রহের আশায় কেউ কেউ ভোর রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে দীর্ঘমেয়াদি টিসিবির কার্ডধারীদের এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়, অতঃপর টিকিট বা টোকেন কিনে টিসিবির পণ্য ক্রয় করতে হয়। এবার একটি পয়েন্টে ট্রাক থেকে ৪০০ জন সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট পয়েন্টে টিসিবির ট্রাকটি কখনো কখনো দশটার পর আসে, কোথাও কোথাও আরও পরে। আবার কোথাও কোথাও একটি নির্দিষ্ট সময় থাকলেও সেই সময়ের পরে আসে। সরকার স্বল্প আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে যে উদ্যোগটি নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়; কিন্তু এই পণ্য কিনতে মানুষের সময়ক্ষেপণ করতে হয়, ফলে শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়। যদিও আমাদের দেশে কর্মের অভাব থাকায় কেউ শ্রমঘণ্টার বিষয়টি তেমনভাবে চিন্তা করে না। রমজান শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু টিসিবির পণ্য সরবরাহ কি বছরের পর বছর, চলতেই থাকবে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় টিসিবির পণ্যের জন্য ট্রাকের পেছনে মানুষের দৌড়ানো কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাস্তবতা তারই প্রতিফলন। টিসিবি পণ্যের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় স্পষ্ট একটি শ্রমঘণ্টার মূল্যায়ন তথা মানুষের কর্মসংস্থান, অপরটি টিসিবির পণ্য বিতরণকে আরও কীভাবে আধুনিকায়ন করে সহজে মানুষের হাতের নাগালে আনা যায়। যেখানে মানুষের লাইনে দাঁড়াতে হবে না সে ব্যবস্থা করা গেলে টিসিবির পণ্য সংগ্রহের এই অমানবিকতা থেকে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এর জন্য প্রকৃত সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারের আন্তরিকতার ওপর। আমাদের এই বিষয়টি  ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, ভোটের মাধ্যমে আমি যে অধিকার রাখি, একজন শ্রমজীবী মানুষও একই অধিকার রাখেন। ফলে সরকারে থেকে, দল-মত নির্বিশেষে তাদের দুর্দশা দূর করাই, আমার প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া দরকার। এখানে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটি বিষয় স্পষ্ট, টিসিবির কম মূল্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে পণ্যসেবার বিষয়টি অবশ্যই মানবিক। এ ব্যাপারে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা প্রত্যাশা করি না। 

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

aktarrofikul@gmail.com