আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। তাদের হাতে মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল। এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে তারা যতটুকু পারবে, ততটুকু কি পারবে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো? কিন্তু তারপর কী হবে? যদি যুদ্ধ প্রলম্বিত হয়, তাহলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ কি সত্যিই কোনো স্বস্তি দেবে? এই তথ্য বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ)। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, ওই সব বেসরকারি কোম্পানি বর্তমান চাহিদার ৪৫/৪৯ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে। অথচ সরকার তাদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করছে না। এ পর্যন্ত বকেয়া পড়ে আছে ১৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। এই পরিমাণ টাকা বকেয়া পড়েছে ৬-৯ মাসের মধ্যে। তার মানে, ৬-৯ মাস ধরে কোনো বিলই পরিশোধ করতে পারেনি সরকার। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ থেমে যায়নি। আমরা জানি, ঢাকা মহানগরের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত বিল আদায় করছে। তাহলে কেন তারা বিল পরিশোধ করছে না বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে? এটা কি কেবল আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে? নাকি অন্য সমস্যা? আমরা ধারণা করি, পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট উৎপাদক/সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো কিছু চিহ্নিত গ্রাহককে মোটা অঙ্কের বিল পরিশোধ না করলেও, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে না। আবার কিছু শিল্পপতি ঘুষ দিয়ে, বিলের পরিমাণ কমায় এবং রেয়াত দিয়ে হলেও বিল পেমেন্ট অব্যাহত রাখেন। এই সমস্যাই সবচেয়ে প্রকট। বিদ্যুৎ সেক্টরে অনৈতিক কাজ বেশি হয়। সেটা ওয়াসার ক্ষেত্রেও।
‘অপচয়’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার বহু নজির আছে। এটা সমাজজীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অথচ মিটার ভাড়াসহ বেশ কয়েকটি খাতের ভাড়া নিচ্ছে পিডিবি। এটা অনৈতিকই কেবল নয়, বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর খড়গ চালানোর শামিল। বিদ্যুৎ খাতে সরকারি জ্বালানি গ্যাস উৎপাদনের তেমন তোড়জোড় নেই বললেই চলে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখতে কেন উৎসাহ নেই, তার পেছনেও আছে দুর্নীতি। জ্বালানি আমদানি করলে কমিশন বা অন্য কোনোভাবে লাভবান হতেই দেশীয় গ্যাসকূপ খোঁজার কাজে চলে ঢিলেমি। পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স এ ব্যাপারে তৎপর হলেও, অর্থ জোগানদাতা মন্ত্রণালয় তেমন উৎসাহী নয়। তাদের চিন্তায় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই বললেই চলে। তাই বাপেক্স কূপ খনন করে গ্যাস পেলেও, তা উত্তোলনের জন্য বিনিয়োগে কেন গড়িমসি, তার জবাবদিহি জরুরি। আজ যে গ্যাস ঘাটতি, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির দরুন এক মহাসংকটের মধ্যে গোটা দেশ পড়েছে, সেই খাদ থেকে আমাদের উঠে আসতে হবে। সেটা করতে হলে, সততার সঙ্গে দেশপ্রেম যুক্ত করতে হবে কাজে-কর্মে ও প্রেরণা-উৎসাহে। এটা সুস্পষ্টভাবে বলা যায়, আমলাদের ভেতরে অধিকাংশের মধ্যে দেশ ও জনগণের কল্যাণচিন্তা নেই।
ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য যে কঠিন পরীক্ষা, সেটা বুঝতে হবে। জ্বালানি সংকটে পড়ে শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষিই কেবল সংকটের আবর্তে পড়েনি সমাজজীবনেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জনগণের মধ্যে শঙ্কা বিরাজমান। তা গভীরতর হতে সময় নেবে না, যদি জ্বালানি সংকট থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে না পারি। এ ক্ষেত্রে পূর্বদিকের দেশগুলো থেকে জ্বালানি কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। ভারত থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল আসছে। চীন ও ব্রুনেই থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া উচিত। তবে ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে বিশ্ববাণিজ্যও থমকে যাবে। আমাদের জ্বালানিও স্বাভাবিকভাবে আসতে পারবে না দেশে। জ্বালানি তেলে আত্মনির্ভশীলতা ছাড়া, প্রগতির চাকা সচল রাখা কঠিন। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে, নিজেদের গ্যাস দিয়েই যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে দ্রুত।