রাঙ্গামাটি-সন্দ্বীপে নৌযান সেবা বন্ধ হওয়ার মুখে

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের তীব্র সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার জ্বালানির রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলেও চাহিদামাফিক তেল না পাওয়ার অভিযোগ গ্রাহকদের। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার ভয়ে অনেকেই অতিরিক্ত তেল কিনছেন, যা কৃত্রিম সংকট ও পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকটে দেশের অনেক এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে পেট্রোল পাম্প। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে বন্ধ হয়ে গেছে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্পিডবোট সেবা। রাঙ্গামাটিতে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে জেলার মানুষের অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম নৌকা।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, রাঙ্গামাটির পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল মিলছে না। হঠাৎ কোনো পাম্পে তেল পাওয়া গেলেও চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। সরকার নির্ধারিত পরিমাণ তেলও দিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত সোমবার দিনভর রাঙ্গামাটি শহরের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, একটি ছাড়া বাকি সব পাম্পে তেল নেই; যা পাওয়া যাচ্ছে, তাও ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাম্পগুলোতে ‘তেল নাই’ লেখা সাঁটিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। একই চিত্র খুচরা দোকানগুলোতেও। তেল না থাকায় রবিবার থেকেই তারা বিক্রি বন্ধ রেখেছে।

খুচরা বিক্রেতারা অভিযোগ করে জানান, চট্টগ্রাম থেকে সরবরাহ না আসায় খুচরা জ্বালানি তেলের দোকানগুলোতে রবিবার থেকে তেল নেই। তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে।

এদিকে জ্বালানি তেল সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহনের চালকরা। সরকারের নির্ধারিত পরিমাণেরও তেল দিচ্ছে না পাম্পগুলো। পণ্য পরিবহনের ট্রাকচালকরা চাহিদামতো তেল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।

মা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বিকাশ দে বলেন, পাম্প ছাড়া কাউকে তেল দিচ্ছে না ডিপো। তাই আমাদের কাছে কোনো তেল নেই। পাম্পগুলোতেও তেল নেই।

রাঙ্গামাটি জেলার ছয়টি উপজেলায় নৌপথই একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম। উপজেলা থেকে কৃষকরাও তেল সংগ্রহে এসেছেন। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো জ্বালানি তেল মিলছে না। খুচরা জ্বালানি তেলের দোকানে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা জ্বালানি নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। রাঙ্গামাটির সঙ্গে নৌপথে স্পিডবোট লাইনম্যান মহিউদ্দিন বলেন, চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রী পরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে।

মোটরসাইকেল চালক রাহুল চাকমা বলেন, গতকাল (রবিবার) ১০০ টাকা তেল দিয়েছে, সোমবার এসে দেখি পাম্পে তেল নাই। খুচরা দোকানেও তেল পাচ্ছি না।

পাম্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রাম থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়ায় কিছু পাম্পে অকটেন, কিছুতে ডিজেল দিচ্ছে। ফলে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, যা পাওয়া গেছে তাও আজ শেষ হয়ে যাবে। আবার নতুন করে পাওয়া যাবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে খুচরা দোকানগুলোতে তেল দিচ্ছে না। বড় বড় পাম্পে রেশনিং করে দিচ্ছে। এটা আমাদের হাতে নেই। তবে রাঙ্গামাটিতে কেউ তেল মজুদ করতে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি করছি। শৃঙ্খলা রক্ষায় পাম্পগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বন্ধ কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটের স্পিডবোট : জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামের কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুটে স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার বন্ধ হয়ে গেছে। গত রবিবার সকাল থেকে হঠাৎ এ রুটে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

বিআইডব্লিউটিএর নিয়োজিত ইজারাদার জগলুল হোসেন নয়ন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে সর্বশেষ সংগ্রহ করা অকটেনের রিজার্ভ রবিবার শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ব্যাংক পে-অর্ডার দেওয়া হলেও তেল সংকটের কারণ দেখিয়ে মেঘনা অয়েল কোম্পানি সেটি ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন এ রুটে যাত্রী পারাপারের জন্য প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার অকটেন প্রয়োজন হয়।’

জানা গেছে, প্রতিদিন এ নৌরুটে স্পিডবোটে প্রায় এক হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। হঠাৎ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই কুমিরা ঘাটে যাত্রীদের ভিড় জমে যায়। অনেকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও গন্তব্যে যেতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

ঘাটে যাত্রী পারাপারের দায়িত্বে থাকা শামছুল আলম দেলু জানান, যাত্রীর চাপ বিবেচনা করে সীমিতভাবে কিছু সার্ভিস দিয়ে যাত্রী পারাপারের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রাম দপ্তরের সহকারী পরিচালক নয়ন শীল বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে স্পিডবোট বন্ধের বিষয়টি আমরা জেনেছি। এটি জাতীয় পর্যায়ের সংকট। তবে ঈদে যাত্রী পারাপারের বিষয়টি বিবেচনা করে মেঘনা অয়েল কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’

এদিকে সাধারণ যাত্রীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ঈদের আর কয়েক দিন বাকি। এর মধ্যে যদি জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম নৌপথে যাত্রী পারাপারে বড় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

ময়মনসিংহে বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ : ময়মনসিংহে জ্বালানি তেলের মজুদ না থাকায় জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন গতকাল হঠাৎ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

জেলা শহরের বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশনগুলোতে লোহার গেট বন্ধ রাখা হয়েছে বা রশি টানিয়ে ‘জ্বালানি নেই’ লেখা বোর্ড দেওয়া হয়েছে। চালকরা তেল পেতে গিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। নগরীর সাইফুল ফিলিং স্টেশন, হাইওয়ে ফিলিং স্টেশন ও টাউন হল সড়কের ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকরাও তেল পাননি।

নগরীর গঙ্গা দাস গুহ রোডের অটোমোবাইল ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী শরীফ বলেন, রবিবার সন্ধ্যার পর থেকেই আমাদের পাম্পের তেলের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। তেলের জন্য চালকরা এসে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, সারা দেশের মতো ময়মনসিংহেও তেলের সংকট রয়েছে। দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।