জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনাকে স্মরণ করে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ সংসদের কাছে জনগণের একটাই প্রত্যাশা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আপনি যদি এ সংসদের ওপর ইনসাফ করেন, তবে ১৮ কোটি মানুষের ওপর ইনসাফ করা হবে। রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় জামায়াত আমির বলেন, বর্তমান সংসদ কোনো সাধারণ বা গতানুগতিক সংসদ নয়; এটি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পবিত্র আমানত।
বক্তব্যের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট কায়সার কামালকে অভিনন্দন জানান। নবনির্বাচিত স্পিকারের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, এ সংসদ যেন কোনো ব্যক্তির চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। তিনি স্পিকারের দলীয় পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আপনি এখন কোনো দলের নন, আপনি ১৬ কোটি মানুষের অভিভাবক। আমরা আশা করি আপনার কাছে সরকারি ও বিরোধী দল সমান গুরুত্ব পাবে।
ডা. শফিক বলেন, স্পিকারের নেতৃত্বে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব অসংগতি ও দুর্বৃত্তপনার অবসান ঘটবে। সংসদের গঠনমূলক প্রতিটি পদক্ষেপে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আমরা আপনার প্রতিটি সংগত বিষয়ে সমর্থন ও সহযোগিতা দেব।
বিগত ৫৫ বছরের সংসদীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি খুব কম সময়ই কার্যকর ছিল। বেশিরভাগ সময় ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে সংসদ ছিল অকার্যকর ও ডামি। অতীতে যারা এ অভিভাবকত্বের চেয়ারে ছিলেন, তারা অনেকেই গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের ওপর সুবিচার করতে পারেননি।
সংসদে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক তরুণ সদস্যের কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, আমি বয়সে বেশি হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে নতুন, তাই আমিও তরুণদের একজন। আমরা চাই প্রবীণ ও অভিজ্ঞদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিখতে। অতীতে সংসদে জনকল্যাণের চেয়ে মানুষের চরিত্র হননে বেশি সময় ব্যয় করা হয়েছে। আমি অনুরোধ করব, আপনার নেতৃত্বে এ মন্দ নজিরের অবসান ঘটুক।
‘এই রাষ্ট্রপতিকে আমরা দফায় দফায় প্রত্যাখ্যান করেছি’ : সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারি দলকে এবং স্পিকারকে অনুরোধ জানিয়েছি, রাষ্ট্রপতিকে যেন ভাষণ দিতে না দেওয়া হয়। তারা আমাদের কথা গ্রাহ্য করেনি। তাই আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে বের হয়ে এসেছি। আমরা আগামীতে এই সংসদে কোনো অন্যায় মেনে নেব না। আমরা জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের পক্ষে লড়াই করে যাব। এ রাষ্ট্রপতিকে আমরা দফায় দফায় প্রত্যাখ্যান করেছি। অস্বীকার করেছি। গত দেড় বছর থেকে আমরা দফায় দফায় রাষ্ট্রপতির নীতিগত বৈধতা অস্বীকার করেছি।
জামায়াত আমির বলেন, এই সংসদ কারও একার নয়, ১৮ কোটি মানুষের সংসদ। জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করতে এসেছি। জনগণের উদ্দেশে বলেন, আমরা আপনাদের রায়কে সম্মান করি, আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধে তার ভাষণ বর্জন করা হয়েছে। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন।
তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবে তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এ শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি।