মুক্তিযুদ্ধের বই কম

অমর একুশে বইমেলার ১৫ দিন পার হয়েছে, এখন পর্যন্ত সবমিলিয়ে নতুন বই জমা পড়েছে ১ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট বই এসেছে মাত্র একটি। গত ৩ মার্চ বাংলা একাডেমির নতুন বই জমাদানের তথ্যকেন্দ্রে ‘মুক্তিযুদ্ধে অবিনাশী ঘটনামালা’ বইটি জমা পড়েছে। সালেক খোকনের লেখা বইটি কথাপ্রকাশ থেকে বের হয়েছে। বইটি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে সাজানো হয়েছে।

প্রকাশনাসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের বাস্তবতায় এবারের মেলায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নতুন বই প্রকাশে ভাটা পড়েছে। তবে এ বই ছাড়াও বেশ কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বইয়ের খোঁজ মিলেছে। মেলা ঘুরে ‘মুক্তিযুদ্ধে অবিনাশী ঘটনামালা’, বাতিঘর প্রকাশ করেছে তানিয়া ঊর্মির ‘সেতারে স্বাধীনতার সুর’, অনন্যা প্রকাশনী থেকে এসেছে মুনতাসীর মামুনের ‘১৯৭১ : অবরুদ্ধ দেশে স্পার্টাকাস’, সুবর্ণ প্রকাশ করেছে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী লুৎফর রহমান স্মারকগ্রন্থ’, জাগতিক প্রকাশনী এনেছে নাওজিশ মাহমুদের ‘স্মৃতি ও রাজনীতি : চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেলেও তা তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও লেখক সালেক খোকনের ভাষ্য, দেশের নতুন প্রেক্ষাপটের কারণে লেখক-প্রকাশকরা কিছুটা মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালেক খোকন বলেন, প্রকাশকদের একটি অংশ বরাবরই ক্ষমতাসীনদের স্তুতিমূলক বই প্রকাশে আগ্রহী থাকে, ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণামূলক গ্রন্থের জায়গা সংকুচিত হয়। অতীতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা প্রকল্পভিত্তিক কাজ হয়েছে, যেগুলোর জন্য অনুদানের ব্যবস্থাও ছিল। এখন সেই উদ্যোগগুলো অনেকটাই থেমে গেছে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকাশক বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর বইয়ের একটি প্রভাব ছিল। কিন্তু দেশের প্রেক্ষাপট পরবর্তী সময়ে পাঠকদের বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের তুলনায় জুলাই অভ্যুত্থানের বইয়ের দিকে একটা বাড়তি নজর রাখছেন। যার ফলে লেখক-প্রকাশকদেরও কিন্তু একটু বাড়তি নজর জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বইয়ের দিকে। এখন প্রকাশক-লেখকদের শক্তি তো পাঠকরাই, এখন যদি তাদেরই আগ্রহ না থাকে, তো সেই বই বের করে তো লাভ নেই।

মেলা হওয়া নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা থাকায় বই প্রকাশ কম উল্লেখ করে লেখক মামুন মুস্তাফা বলেন, বই কম প্রকাশের পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে, অনেক অনিশ্চয়তা কেটে এবারের মেলা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দিনও কম, তাই পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতির পাশাপাশি বিক্রিও কম। পাঠককে সচেতন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এখন পাঠকরাও অনেক চতুর। তারা প্রয়োজনের বেশি নিতে চান না। সেটি বই পড়ার বেলাতে একই। সে ক্ষেত্রে আমরা যারা লেখক আছি, তাদেরও পাঠকদের প্রতি খেয়াল রেখে যতœশীল হতে হবে।

এদিকে মেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্টল দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বই, পোস্টার, স্মারক বুকলেট, পোস্টার, মানচিত্র খচিত পতাকাসহ বিভিন্ন সামগ্রী রয়েছে। এ ছাড়া স্থান পেয়েছে বিগত কয়েক বছর আগে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বেশকিছু বই। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই গত কয়েক বছরে প্রকাশিত।

স্টলের দায়িত্বে থাকা জাদুঘরের স্মারক সংগ্রাহক হারেছ-উজ-জামান বলেন, অন্য বছরের মতো মেলায় পাঠক-দর্শনার্থী তুলনামূলক অনেক কম। কম সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবারের মেলাতে। তারপরেও যুদ্ধকালীন সময়ের ঐতিহাসিক ছবিগুলো নিয়ে পাঁচটি করে সেট আকারে ভিউকার্ডে তুলনামূলক একটু বেশি সাড়া পাচ্ছি।

বইমেলায় এসেছে নতুন ৮২টি বই : গতকাল বৃহস্পতিবার বইমেলার ১৫তম দিনে মেলা দুপুর ২টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়। এদিন তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ৮২টি। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৩৩৭টি। মেলায় এসেছে স্বপ্ন ’৭১ থেকে ড. মো. এমরান জাহানের ‘পলাশীর যুদ্ধ সত্যের অনুসন্ধানে’, মাওলা থেকে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর ‘বিস্ময় তাই জাগে’, কথাপ্রকাশ থেকে রিদওয়ান আক্রামের ‘পুনশ্চ ঢাকা’সহ বেশকিছু নতুন বই। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে সাংবাদিক ও কবি তৌহিদুর রহমানের কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদয় পোড়া গন্ধ’। প্রায় ৮০টি কবিতা সংবলিত গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৫৫৭ নম্বর স্টলে পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকাশক জানান, এই কাব্যগ্রন্থে সংকলিত সত্তরের বেশি কবিতায় প্রেম, বিচ্ছেদ ও বেদনার চিত্র উঠে এসেছে। উঠে এসেছে সময় ও সমাজের নির্মম বাস্তবতা। নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন ও হতাশার সংঘাত মিলিয়ে এই গ্রন্থ বহুমাত্রিক অনুভূতির জগৎ নির্মাণ করেছে।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : মুস্তাফা জামান আব্বাসী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে শারমিনী আব্বাসীর লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মোকারম হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন আশরাফুজ্জামান বাবু। সভাপতিত্ব করেন ওয়াকিল আহমদ।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন আতাহার খান, ফজলুল হক তুহিন এবং জামশেদ ওয়াজেদ। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ।

আজকের সময়সূচি : আজ শুক্রবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। সকাল ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করা হবে। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেবেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করবেন আনু মুহাম্মদ। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।