বিশ্বকে মানবতার পাঠ পড়াতে আসা যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে বেশি অমানবিক। আগে ফাঁকা বুলি কিংবা মিষ্টি কথার আড়ালে দেশটির ভয়াল রূপটি ঢাকা থাকত। এখন আর রাখঢাক নেই, মানবতার রূপ কেমন তা তাদের কাজ দেখলেই বোঝা যায়। এতদিনে ইরানে যা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। অথচ যুদ্ধবাজ ট্রাম্পকে থামানোর কেউ নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা দিন দিন কঠিন হচ্ছে। স্কাই নিউজ বলছে ইরানের যুদ্ধ যখন তীব্র হচ্ছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া ভাষায় বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু একটি বিষয় তার চেয়েও জোরে কথা বলে তা হলো, এক ব্যারেল তেলের দাম। ট্রাম্পের কথাগুলোকে নিছক সস্তাই মনে হয়, তবে তেলের দাম নিষ্ঠুরভাবে সৎ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, যুদ্ধ ‘শিগগিরই’ শেষ হতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা শব্দের ওপর বাণিজ্য করে না। তারা ঝুঁকি নিয়ে বাণিজ্য করে। দশ দিন আগে, তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এখন গর্ব করে বলছেন এই যুদ্ধ ‘খুব শিগগির’ শেষ হতে পারে। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যের তালিকা তৈরি করেছেন। পাঁচ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে বলে গর্ব করছেন।
আল-জাজিরা বলছে, ট্রাম্প কেবল নিজের বিজয় ঘোষণার জন্য উদগ্রীব। কিন্তু তার নতুন আশাবাদ এমন একটি স্থানে স্থাপিত হয়, যেখানে রাজনীতি এবং বাজার সংঘর্ষে লিপ্ত। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপর সমাপ্তির কথা বলে রেকর্ড ৪% কমে যায়। ট্রাম্পের জন্য এটি একটি সমস্যা যে, ইরান এরই মধ্যে এ যুদ্ধে সামরিক কোডনাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ উপহাস করে স্বীকার করেছে। পরে তারা নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক মিসটেক’। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেলের দামের একটি গ্রাফিকের সঙ্গে এ নামটি পোস্ট করেছেন। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বলেছে যে, এটি ‘যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে তেহরান এই অঞ্চল থেকে ‘এক লিটার তেল’ও রপ্তানি করতে দেবে না। যদিও ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, ‘যদি ইরান এমন কিছু করে, যদি হরমুজ প্রণালিতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে তারা এখন পর্যন্ত যতটা আঘাত পেয়েছে তার চেয়ে বিশগুণ বেশি আঘাত পাবে।’ সংঘাতের সময় ব্যারেলের দাম প্রেসিডেন্টের শান্তির প্রতিশ্রুতির চেয়েও জোরে এবং আরও সত্য কথা বলে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর প্রথমবারের মতো, এ পর্যন্ত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এমনটা হয়েছে ইরানে হামলার পরই, জ্বাালানি অনিশ্চয়তার কারণে। বিশে^র প্রায় ২০ শতাংশ তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে এবং এর বেশিরভাগই বিশাল ট্যাঙ্কারে করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো হয়। ইরান এবং ওমানের মধ্যে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথটি তার সংকীর্ণতম স্থানে মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (৩৯ কিমি) প্রশস্ত। প্রতিদিন ২০ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করে, যা বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে লেনদেন হওয়া সমস্ত তেলের এক-চতুর্থাংশ।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে আক্রমণ এবং নেভিগেশন সরঞ্জামে হস্তক্ষেপের ফলে বেশিরভাগ অপারেটর তাদের জাহাজগুলোকে জলপথের কিনারায় নোঙর করতে বাধ্য করেছে। এই তেলের প্রবাহ ছাড়া, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সীমিত সরবরাহ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে, দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভোক্তা এবং ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘যুদ্ধ সম্পন্ন, মোটামুটি’ বলার পর গত সোমবার দাম কিছুক্ষণের জন্য কমে গেলেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন, তেল আবিব এবং তেহরানের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৮৯ শতাংশ তেল এশিয়ান বাজারে যায়, যেখানে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া শীর্ষ ক্রেতা। যদি যানবাহন চলাচল সীমিত থাকে, তাহলে উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবেন, তবে সৌদি আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতা প্রদান করে। সৌদি পাইপলাইনটি পূর্ব তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত চলে, যা হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণরূপে বাইপাস করে এমন কয়েকটি রুটের মধ্যে একটি। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য তথ্য এবং বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের মতে, ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭.২ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে ৬.৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রণালির মধ্য দিয়ে যাতায়াতের ওপর নির্ভর করত।
ইরানসহ উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরা প্রণালির বাইরের টার্মিনালে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ট্যাঙ্কার পরিবহনের সিংহভাগ স্থগিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিশে^ প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহে হঠাৎ ঘাটতি দেখা দেবে। এগুলো হাজার হাজার দৈনন্দিন পণ্যের কাঁচামাল। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেজিং, ফোনের আবরণ এবং চিকিৎসা সিরিঞ্জসহ প্লাস্টিক পণ্য সবই অপরিশোধিত তেল থেকে প্রাপ্ত। পলিয়েস্টার, নাইলন এবং অ্যাক্রিলিকের মতো সিন্থেটিক কাপড়ের মধ্যেও অপরিশোধিত তেল লুকানো উপাদান, যা স্পোর্টসওয়্যার থেকে শুরু করে কার্পেট পর্যন্ত সবকিছুতে পাওয়া যায়। এটি পেট্রোলিয়াম জেলি, লিপস্টিক এবং কনসিলারসহ প্রসাধনী শিল্পের ওপরও নির্ভর করে। গৃহস্থালীর জিনিসপত্র তেল-ভিত্তিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে যার মধ্যে লন্ড্রি ডিটারজেন্ট, ডিশ ওয়াশিং তরল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে প্রাপ্ত রঙ রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ মূলত সার আকারে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ফসলের ফলন বৃদ্ধি করতে এবং খাদ্য উৎপাদন চাহিদা মেটাতে পারে তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়। তেল এবং খাদ্যের দাম লকস্টেপে চলে, শক্তির দাম খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি পর্যায়ে প্রভাব ফেলে, জমিতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে সুপার মার্কেটের তাক এমনকি খাদ্য বহনকারী ট্রাক পর্যন্ত। তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি জাহাজীকরণ এবং পরিবহন খরচকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণশক্তি পরিবহন। এটি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছে। এটি একটি সরবরাহ শৃঙ্খল, এ জন্য পরিবহন হলো বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি। আর তেল ছাড়া সবই অচল। আর এ কারণেই মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেল সংকটের কারণে সব শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। অর্থনীতিবিদরা ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছে বলেছেন, তেলের দামের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির পরে, কোনো না কোনোভাবে, বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিয়েছে। নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যা তাদের আয়ের অনেক বেশি অংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে এবং প্রচুর পরিমাণে শস্য ও সার আমদানি করে। সেখানে তেলের দাম বৃদ্ধি দ্রুত খাদ্য ঘাটতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে বেড়েছে মুসলিম বিদ্বেষ। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা ‘অমানবিক ভাষা’ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। মুসলিমদের ‘কীটপতঙ্গ’, ‘ইঁদুর’, ‘পোকামাকড়’, ‘পরজীবী’ এবং ‘আক্রমণাত্মক’ হিসাবে উল্লেখ করছেন। অনেক মার্কিন সামরিক কমান্ডার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’ বলেও অভিহিত করেছেন। তারা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধনীতি প্রণয়ন করছেন। ঘৃণা ছড়িয়ে মুসলমানদের হত্যাযোগ্য বানাতে উদগ্রীব মার্কিনিদের একটা পক্ষ। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘জয়লাভ’ করছে। কিন্তু যুদ্ধ কখন শেষ হবে সে সময়সীমা দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি প্রেসিডেন্টের হাতে। ইরানে সর্বোচ্চ হামলারও হুংকার দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ইরান বলছে, ‘তোমার চেয়ে শক্তিশালীরা আমাদের জাতিকে নির্মূল করতে পারেনি। যারা চেষ্টা করেছে তারা নিজেরাই নিশ্চিহ্ন হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যদি অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তাহলে তেহরান ‘চোখের বদলে চোখ’ তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থানীয় সংঘাতের বাইরে চলে গেছে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব জুড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক এবং অবৈধভাবে আরোপিত এই সংঘাত কেবল কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই ব্যাহত করেনি, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। এই আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায়, ইরান আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার প্রয়োগ করছে যা আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। দেশটির জন্য, এ যুদ্ধ সীমিত লাল রেখা এবং কৌশলগত বাধ্যবাধকতা দ্বারা পরিচালিত একটি বেঁচে থাকার যুদ্ধ। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাব সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে, বাংলাদেশের জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ আসবে।
লেখক : সাংবাদিক
mshossain.sujan@gmail.com