রমজানের শেষ ১০ দিনের অন্যতম ইবাদত ইতিকাফ। ইসলামের বিধান অনুযায়ী ইতিকাফ শুধু পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট নয়, নারীরাও এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করতে পারেন। বরং নারীদের জন্য এ ইবাদত পালন করা অনেক ক্ষেত্রে সহজ। কারণ তারা নিজ গৃহেই নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে ইতিকাফ করতে পারেন। তবে ইতিকাফের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য কিছু বিশেষ বিধান ও মাসয়ালা রয়েছে, যা জানা অত্যন্ত জরুরি। ইতিকাফের সময়, স্থান, পবিত্রতা, পারিবারিক দায়িত্ব, স্বামীর অনুমতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিধান সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে এ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা কঠিন হতে পারে। তাই নারীদের জন্য ইতিকাফের গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা জানা এবং তা অনুযায়ী আমল করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে এই মহান ইবাদতের পূর্ণ ফজিলত অর্জন করা সম্ভব হয়।
নবীজি (সা.)-এর স্ত্রীরা নিয়মিত ইতিকাফ পালন করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘নবী (সা.) মৃত্যু পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। তার ইন্তেকালের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীরাও ইতিকাফ পালন করেছেন।’ (সহিহ বুখারি)
আমাদের দেশে নারীদের মধ্যে ইতিকাফের প্রচলন তুলনামূলক কম। নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই, তারা নিজ ঘরে বসেই ইতিকাফ পালন করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন পর্দার বিধান রক্ষা পায়, অন্যদিকে নিয়ম মেনে সংসারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়াও সম্ভব হয়। পুরুষদের উচিত তাদের ঘরের নারীদের এই মহৎ ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
নারীদের ইতিকাফের স্থান হলো তাদের ঘরের অন্দরমহল। হাদিস শরিফে নারীদের ঘরের কোণে নামাজ পড়াকে মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়েও বেশি সওয়াবের কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই নারীরা ঘরের কোনো একটি নির্দিষ্ট কক্ষ বা কক্ষের নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে ইতিকাফের জন্য বেছে নেবেন। যদি আগে থেকে নামাজের জন্য কোনো স্থান নির্ধারিত থাকে, তবে সেখানেই বসবেন; অন্যথায় ইতিকাফের নিয়তে একটি জায়গা নির্ধারণ করে নেবেন এবং পূর্ণ সময় সেখানেই অবস্থান করবেন। (বাদায়েউস সানায়ে ২/১১৩)
বর্তমানে অনেক নারী রমজানে ওমরাহে গিয়ে মসজিদুল হারাম বা মসজিদে নববীতে ইতিকাফ করতে চান। হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী, নারীদের জন্য মসজিদে ইতিকাফ করা সমীচীন নয়, বরং তাদের ইবাদতগাহ হলো তাদের নিজ ঘর। এমনকি মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রীদের ক্ষেত্রেও বিধান হলো, তারা মাদ্রাসায় ইতিকাফ না করে নিজ নিজ বাড়িতে ইতিকাফ সম্পন্ন করবে। কারণ ইতিকাফের জন্য ঘরই হলো নারীদের জন্য সর্বোত্তম স্থান। (মাবসুতে সারাখসি ৩/১১৯)
বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে ইতিকাফে বসার জন্য স্বামীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। স্বামীর অনুমতি ছাড়া ইতিকাফে বসা জায়েজ নয়। তবে ইতিকাফের কারণে যদি ছোট সন্তান প্রতিপালন বা ঘরের অপরিহার্য কোনো কাজে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে, সে ক্ষেত্রে ইতিকাফ না করে নিজ দায়িত্ব পালন করাই অধিক সওয়াবের কাজ। কারণ ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা, কিন্তু পারিবারিক অপরিহার্য দায়িত্ব পালন করা ওয়াজিব সমতুল্য। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৪১)
ইতিকাফের জন্য পবিত্রতা ও রোজা রাখা শর্ত। তাই ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) অবস্থায় ইতিকাফ সহিহ হবে না। নারীদের উচিত ইতিকাফে বসার আগে তাদের ঋতুস্রাবের দিন-তারিখ হিসাব করে নেওয়া। ইতিকাফ শুরু করার পর যদি পিরিয়ড শুরু হয়ে যায়, তবে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে ওই অবস্থার জন্য কোনো গুনাহ হবে না, তবে পরবর্তী সময়ে ওই এক দিনের ইতিকাফ রোজাসহ কাজা করে নিতে হবে। যদি কোনো মহিলা ওষুধের মাধ্যমে পিরিয়ড বন্ধ রেখে রোজা ও ইতিকাফ করেন, তবে তা আদায় হয়ে যাবে, যদিও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। (হিন্দিয়া ১/২০৭)
ইতিকাফকারী নারী তার নির্ধারিত স্থান থেকে ইসলামসম্মত প্রয়োজন (যেমন অজু, ইস্তিঞ্জা বা ফরজ গোসল) ছাড়া বের হতে পারবেন না। অজু-ইস্তিঞ্জার জন্য কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত বাথরুম থাকলে সেখানেই যেতে হবে। যদি খাবার দেওয়ার মতো কেউ না থাকে, তবে ইতিকাফের স্থানে রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এসে সেখানে বসেই রান্না করা যাবে। অযথা ইতিকাফের স্থান থেকে বের হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (হিন্দিয়া ১/২১১)
ইতিকাফ অবস্থায় একেবারে চুপ থাকা ইবাদত নয়, বরং প্রয়োজনীয় কথা বলা জায়েজ। ইতিকাফের স্থানে কেউ দেখা করতে এলে তার সঙ্গে পর্দা বজায় রেখে কথাবার্তা বলা যাবে। স্বামীও ইতিকাফকারিনীর পাশে বসতে পারবেন এবং কুশলাদি বিনিময় করতে পারবেন, তবে শারীরিক সম্পর্ক বা স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণ ইতিকাফ অবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (সুনানে আবু দাউদ ২৪৭২)
যদি কোনো কারণে (পিরিয়ড শুরু হওয়া বা বিনা ওজরে ইতিকাফের স্থান ত্যাগ করা) সুন্নত ইতিকাফ ভেঙে যায়, তবে পুরো ১০ দিনের কাজা জরুরি নয়, বরং যেদিন ইতিকাফ ভেঙেছে, শুধু সেই দিনের কাজা আদায় করলেই চলবে। কাজা করার নিয়ম হলো, পরবর্তী সময়ে যেকোনো এক দিন সূর্যাস্তের আগে ইতিকাফের নিয়তে বসে পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যস্ত অবস্থান করা এবং ওই দিন রোজা রাখা। (রদ্দুল মুহতার ২/৪৪৫)
রমজান মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সময়। এই মাসে ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। রোজা, তারাবি, কোরআন তেলাওয়াত ও দান-সদকার পাশাপাশি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ এমন একটি বিশেষ ইবাদত, যা মানুষের হৃদয়কে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে আল্লাহর দিকে একান্তভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ দেয়। এটি এমন এক মহৎ আমল, যার মাধ্যমে বান্দা আত্মিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা লাভ করে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক