ঈদের আগের দিনে কার কী ভালো লাগে, সেটাই আজ জানবে বলে ঠিক করেছে দীপু। কার কাছে জানবে?
বাইরে পাখির কাছে, ফুলের কাছে, নদীর কাছে।
ঘরে দাদার কাছে, বাবার কাছে, মায়ের কাছে।
দাদির কাছেও জানতে চাইত। কিন্তু দাদি গেছে দীপুর ফুফির বাসায় বেড়াতে। বেড়ানো শেষ করে বাড়ি এলে, তখন জানবে।
প্রথমে সে গেল দাদার কাছে।
দাদাকে বলল, ‘আচ্ছা দাদা, ঈদের আগের দিন তোমার কী ভালো লাগে?’
দাদা বললেন, ‘ছোটবেলায় ভালো লাগত আব্বা, আম্মার কাছে থেকে উপহার পাওয়া নতুন জামা, প্যান্ট, জুতা আর খেলনাগুলো বারবার দেখতে। এখন ভালো লাগে আমার দীপু দাদাভাইকে নিয়ে গল্প করতে। তোমার কী ভালো লাগে, দাদাভাই?’
দীপু বলল, ‘মামা এলে।’ এই বলে সে চলে গেল।
দীপুর একটাই মামা। থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। একবারই ঈদ করেছিল দীপুদের সঙ্গে। ঈদের আগের দিন এসেছিলেন। ঈদের দিনটা দীপুর সঙ্গে কাটিয়ে পরের দিন চলে যান। তখন দীপুর তিন বছর বয়স মাত্র। দীপুর দাদা কিছুতেই ভেবে পেলেন না, তিন বছর বয়সের দীপু বুঝল কী করে যে, মামা এলে তার ভালো লাগে!
এবার দীপু ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
একই সঙ্গে দেখতে পেল ফুল ও পাখি।
পাখিটা সামনের দালানের কার্নিশে বসে আছে।
বারান্দার টবে ফুল।
দীপু দুজনকে উদ্দেশ করেই বলল, ‘ও ফুল! ও পাখি! ঈদের আগের দিন তোমাদের কী ভালো লাগে?’
পাখি বলল, ‘আমার উড়তে। উড়ে উড়ে চারিপাশে যখন দেখি শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বুড়ো-বুড়ি সবাই ঈদের আনন্দ করছে; খুব ভালো লাগে আমার।’
ফুল বলল, ‘আমার ফুটতে। ঘরে ঘরে মেহেদী পরা বালিকাদের কাছে যেতে ভালো লাগে আমার। ঈদের দিন সকালে তারা আমায় খোঁপায় পরবে তাই।’
ওদের কথা শুনে দীপু হাসে।
হাসতে হাসতে মায়ের কাছে এলো। বলল, ‘জানো মা, ঈদের আগের দিন পাখির উড়তে ভালো লাগে। ফুলের ফুটতে ভালো লাগে।’
মা বললেন, ‘ওরা তাই বলল?’
‘হ্যাঁ মা! বলল তো!’
‘বলেছে কারণ পাখিদের উড়তে দেখলে, ফুলদের ফুটতে দেখলে তোমার ভালো লাগে তাই।’
‘ঈদের আগের দিন তোমার কী ভালো লাগে, মা?’
‘ছোটবেলায় হাতে মেহেদী লাগাতে ভালো লাগত। এখন তোমাদের জন্য পিঠা-পায়েস বানাতে আর সুস্বাদু খাবার রান্না করতে ভালো লাগে। তোমার কী ভালো লাগে?’
দীপু বলল, ‘মামা এলে।’ এই বলে সে চলে গেল।
‘মামা এলে! ছেলে বলে কী! তিন বছর বয়সের দীপুর এখনো মামার কথা মনে আছে!’ একাই বিড়বিড় করে বলছেন দীপুর মা। ছেলের স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো ভাবতে ভাবতে নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেন।
বিকেলে বাবার সঙ্গে নদীর পাড়ে বেড়াতে এলো দীপু।
সেই দুপুর থেকে বাবাকে বলতে বলতে রাজি করিয়েছে নদীর পাড়ে নিয়ে আসতে। এসেই নদীকে বলল, ‘ও নদী! ঈদের আগের দিন তোমার কী ভালো লাগে?’
নদী বলল, ‘অপেক্ষা করতে। ঈদের দিনের অপেক্ষা। সেদিন সকালে কত কত মানুষ আসে নদীতে গোসল করতে। উফ! কী যে ভালো লাগে আমার! এই ভালো লাগা ঈদের আগের দিন অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে যায়।’
দীপু হাসতে হাসতে নদী যা যা বলল সব বলল বাবাকে।
শুনে বাবা বললেন, ‘ঈদের দিন সকালে মানুষ নদীতে গোসল করতে যাচ্ছে দেখে তোমার ভালো লাগে। একবার ঈদের দিন সকালে আমাদের কলপাড়ে ভিড়, গোসলের সিরিয়াল লেগে গেছে। ওদিকে ঈদের নামাজের সময় যাচ্ছে। আমাদের ঈদগাহ মাঠে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি গোসল করতে তুমি আর আমি নদীতে গিয়েছিলাম, মনে আছে তোমার?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। ঈদের আগের দিন তোমার কী ভালো লাগে বাবা?’
‘ছোটবেলায় বেলুন দিয়ে ঘর সাজিয়ে, ঈদ মোবারক লিখতে ভালো লাগত। এখন ঘরের জন্য ঈদের বাজার করতে ভালো লাগে। তোমাদের কার কী লাগবে খোঁজ নিতে ভালো লাগে। তোমার কী ভালো লাগে?’
দীপু বলল, ‘মামা এলে।’ এই বলে সে একটুখানি এগিয়ে নদীর কাছে গেল। আলতো করে পানি ছুঁয়ে বলল, ‘ঈদে আমাদের বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ রইল। ফুল, পাখিকেও নিমন্ত্রণ করব। এসো কিন্তু! আমরা একসঙ্গে গান গাইব, ছবি আঁকব, গল্প করব, কেমন?’
দূর থেকে ছোট্ট করে একটা ঢেউ এসে দীপুকে একটুখানি ভিজিয়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা।’
সন্ধ্যায় বারান্দায় ফুলের সঙ্গে গল্প করছিল দীপু। ঘরে দীপুর মা, বাবা আর দাদা গল্প করছে। তিনজনেই একটা বিষয় নিয়ে ভারি অবাক! তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, তিন বছর বয়সের দীপু মামা এলে যে মজা হয় তা কী করে বুঝলো! এরই মধ্যে দীপু দৌড়ে এসে বলল, ‘মামা এসেছে! মামা এসেছে!’
চমকে উঠল দীপুর মা। বললেন ‘বলিস কী! একটু আগেই না ফোনে অস্ট্রেলিয়ায় তোর মামার সঙ্গে কথা হলো! সে আসবে কোথা থেকে!’
দাদা বললেন, ‘কোথায়?’
দীপুর বাবা তো উঠে দরজার দিকে হাঁটা দিল।
হাঁটতে হাঁটতে বলছে, ‘কোথায় তোর মামা, কোথায়?’
দীপু বলল, ‘আকাশে। কাল ঈদ।’