ঈদের আগেই শুরু খাল খনন কর্মসূচি

বন্যার দুর্যোগ থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে এবং ফসলের উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। একই দিনে দেশের আরও ৫৩টি এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হবে।

কৃষির পাশাপাশি মাছচাষ, হাঁসপালন ও সংশ্লিষ্ট অন্য সেক্টর এ কর্মসূচির দ্বারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানান সরকারের একাধিক মন্ত্রী। তারা বলেন, দীর্ঘদিন খাল খনন না করায় দেশব্যাপী জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। দুর্ভোগ লাঘবে খাল খনন কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা করেছে। ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতো নিজে কোদাল নিয়ে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনী প্রচারণাকালে খাল খননের কর্মসূচি শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।’

পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে সিলেটে আগাম বন্যা হয়। ফেনী বন্যায় তলিয়ে যায়। এসব বিষয় নিয়ে যুক্তরাজ্যে থাকাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভেবেছেন। বিশ্বের কোথায় কোথায় এ সমস্যা রয়েছে। তার সমাধান কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে ভেবেছেন। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছেন। তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে খাল খনন কর্মসূচির কথা বলেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় খাল খনন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি; ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। আমরা সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই কোদাল হাতে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।’

সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রী দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া পরিদর্শন করেছেন। সেখানকার খাল পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কর্মসূচি আবার শুরু হলে জনগণের দাবি পূরণ হবে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা দূর হবে, সেচ সুবিধা এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল; ওই সময়ে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। এসবের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল। লক্ষাধিক একর জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওই কর্মসূচি বর্ষার পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন ও খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করেছিল।’

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে ব্যক্তিগতভাবে মাটি কেটে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে নেত্রকোনার তিলকখালিতে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন তিনি। এর ফলে ১৯৮০ সালে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ এবং জাতীয় পর্যায়ে নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচিবিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় স্থানীয় সরকার, পানি, দুর্যোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় বসে ঠিক করবে কবে নাগাদ এটি শুরু হবে। পরে ঠিক হয় ১৮০ দিনের মধ্যে এ কাজের বেশিরভাগ সম্পন্ন করা হবে।

গতকাল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-৩ শাখা থেকে এক পরিপত্রের মাধ্যমে জানানো হয়, ৫৩টি জেলায় মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যরা এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এ কর্মসূচি কৃষি ও সেচ কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে; কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে ভূউপরিস্থ পানির পরিমাণ বাড়ার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে; যার ফলে খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমবে।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল দুপুরে কাহারোলের বলরামপুরের সাহাপাড়ায় প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারগুলো খালের সংস্কার বা পুনঃখনন করেনি। বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব এবং শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমবে এবং ফসলের উৎপাদন বাড়বে; দেশ মরূকরণের হাত থেকে রক্ষা পাবে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম। এ অঞ্চলে বৃক্ষরোপণের হার মাত্র ৮-৯ শতাংশ, অথচ পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য ২০-২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি।’

ডা. জাহিদ হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচির সূচনা হবে। একই দিনে বাংলাদেশের ৫৩টি এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘যেমন ফ্যামিলি কার্ড আমরা ১৪টি জায়গায় চালু করেছি, ঠিক একইভাবে খাল খনন কর্মসূচিও ১৬ মার্চ উদ্বোধন করা হবে।’

এ সময় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের এমপি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গত ৯ মার্চ নেত্রকোনা সদর উপজেলার মেদনী ইউনিয়নের কৃষ্ণাখালী এলাকায় তিলকখালি খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘সারা দেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের’ আওতায় এ কাজ করা হচ্ছে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার কাদাপাশা এলাকায় কপালতলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে। শহীদ জিয়ার খাল খননের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন করে খাল খনন কর্মসূচির ফলে জোয়ারের পানি সরাসরি কৃষকের জমিতে পৌঁছে যাবে।’ তিনি বলেন, সরকারের বনায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃক্ষরোপণ অভিযানও শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।