পুরনো আমলাতন্ত্রেই আটকে সরকার

প্রশাসনে বড় সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রস্তাবিত ২০৮টি সুপারিশ সেই আশাকে আরও জোরালো করেছিল। কিন্তু বদলি, পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো দেখে অনেকেরই প্রশ্ন সংস্কারের আলোচনার আড়ালে কি আবারও শক্তিশালী হচ্ছে পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো?

বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার চেয়ার বদলালেও আমলাতন্ত্রে এখনো বহাল রয়েছে পুরনো চর্চা, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আস্থাই অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে।

এর আগে তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনা করা বিএনপি শুরুতেই আগের সরকারগুলোর মতোই যাত্রা শুরু করেছে। প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন প্রতিমন্ত্রীকে। কার্যত মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেই রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী এখনই আগ্রাসী কোনো পরিবর্তনে যাবেন না। তবে তারা এও মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী সময় নিয়ে হলেও এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। তার ওপর ভরসা রাখতে চান সংশ্লিষ্টরা।

এসব বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের চেয়ে আমলাতন্ত্র ভয়ংকর। এখানে যে কৌশলী ফাঁদ পাতা আছে সেটা প্রধানমন্ত্রী যত দ্রুত ধরতে পারবেন প্রশাসন তত ভালো কাজ করবে। জনগণের কল্যাণের প্রশাসন তৈরি করতে কঠোর মনিটরিং লাগবে। দক্ষ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে, সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারি কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি সার্ভিসের অধীনে থাকা সমিতিগুলোর কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা বা দাবি-দাওয়া আদায়ে বিক্ষোভ কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো বর্তমান সরকারও অন্তর্বর্তী সরকারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডি করার আগের প্রবণতাই বহাল এখনো। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস না হতেই এরই মধ্যে অন্তত ৭ জনকে সচিব বা সমমানের পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং একজনকে করা হয়েছে ওএসডি। আরও কয়েকজন সচিবকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৯ সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রাখতে বর্তমান সরকারও পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। যদিও এতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের একটি অংশে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান থাকলেও সেটি নিয়মে পরিণত হলে প্রশাসনের স্বাভাবিক পদোন্নতি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন বিষয়ক সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে।

প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক নিয়োগের সমালোচনা করে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সব প্রজন্মের মানুষ একটা পরিবর্তন চেয়েছে। সেই পরিবর্তন পজিটিভ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি হতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো দেশে সবাই শুধু নিজে পেতে চায়। ক্রমাগত পেতে চাওয়া এই প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করাটা খুবই কঠিন। চাহিদা কমিয়ে আনতে পারলে দেশের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি হলে গুণগত পরিবর্তন আসবে।’  

‘আগামীতে সরকার যদি সত্যিই দেশকে ভালোভাবে পরিচালনা করতে চায়, তাহলে সব জায়গায় মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, সুনামের ভিত্তিতে এবং প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তিদের দিয়েই প্রশাসন সাজাতে হবে। না হলে ভালো ফল পাওয়া কঠিন হবে’ যোগ করেন তিনি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে চারজনকে সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়েও অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক সচিব করা হয়েছে। এছাড়া, সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে চুক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ইমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। সাবেক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনকে করা হয়েছে ওএসডি।

প্রশাসনে দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন তো হয়ইনি, বরং পরিবর্তনের নামে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিঞা।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্যসিস্ট আমলের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন আরও দুর্বল হয়েছে। সেই দুর্বলতা কাটােেত নতুন সরকারের পদক্ষেপ সঠিক হচ্ছে না। এতে প্রশাসন ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদি সরকার শক্ত হাতে সঠিকভাবে প্রশাসন চালিত না করে তাতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে। জনগণের ভোগান্তি কমবে না। সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে আগের ধারাই বহাল রয়েছে যা উচিত হয়নি।’

বর্তমানে ২৬টি সার্ভিস ক্যাডার রয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। সরকারি কর্মচারী বাতায়নের তথ্য মতে, জনপ্রশাসনে ৬ হাজার ৫৪১ জন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা রয়েছেন। যাদের মধ্যে ৬৮ জন কর্মরত সচিব ও সিনিয়র সচিব পদে।

ক্যাডার সার্ভিস নিয়ে নানান বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব বৈষম্য নিরসনে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস (এসইএস) গঠনের সুপারিশ করে এ সংক্রান্ত কমিশন। এই নতুন কাঠামোর অধীনে উপসচিব থেকে শুরু করে সচিব, এমনকি সিনিয়র সচিব পর্যন্ত সব পদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিভিন্ন ক্যাডার থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে এসইএস-এ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

উপসচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত পদগুলো সরকারের পদ বা রাজনৈতিক পদ হিসেবে বিবেচনা করার অলিখিত রেওয়াজ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এক্ষেত্রে সরকার যাদের অনুগত মনে করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই পদোন্নতি পান, যোগ্যতা থাকলেও রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে অন্যদের করা হয় বঞ্চিত।

পটপরিবর্তনের পর অনেক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এখন বিভিন্ন পদে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। তাদের জন্য বিভিন্ন পলিসি অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন জনপ্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা।

তারা মনে করেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে উপদেষ্টা বা পরামর্শক হিসেবে তাদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তাদের পরামর্শ সরকার কাজে লাগাতে পারবে। কিন্তু আগের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হলে জনপ্রশাসন কার্যকর থাকবে না। যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে চলতি কর্মকর্তাদের পদায়ন হওয়া প্রয়োজন। যারা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়াবেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’

আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক ড. মুহম্মদ মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার আসে সরকার যায়। বদল হয় ব্যক্তির। কিন্তু প্রশাসনে বৈষম্য ও সাম্য নিশ্চিত করতে যে আধুনিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন সেটিই গড়ে ওঠেনি।’

তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। বরং তৈরি হয়েছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। রাজনৈতিক সরকার এসে এখন যে পরিবর্তন আনছে তাতে মৌলিক কোনো পরির্তন হচ্ছে না। প্রশাসনে যেই ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র ভর করেছে তাতেই চলছে যুগের পর যুগ।

তার ভাষায়, ‘এই কাঠামো নতুন সরকার খুব পরিবর্তন করবে এমনটাও আশা করি না। তবে ঈদের পর আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আবারও কর্মসূচিতে যাব।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন টিকিয়ে রাখতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন আমলারা। একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাজে লাগিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী সরকার। মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সব স্তরেই প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪-২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।

সরকারের উচ্চপদে পদায়নে বৈষম্য নিরসনসহ বেশ কিছু লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালে সিনিয়র সার্ভিস পুল (এসএসপি) চালু করেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জনমুখী, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ প্রশাসন কাঠামো গড়ে তুলতে এসএসপির মাধ্যমে সে সময় লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চপদের জন্য বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। এতে জনপ্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডারের প্রাধান্য কমে যাওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়। তাই সে সময় প্রশাসন ক্যাডারদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে। ফলে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেভাবে গতি আসেনি। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এসএসপির কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার সেটি বাতিল করলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত হয়।