ইরানে স্থল অভিযানের ইঙ্গিত

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। আজ রবিবার এই সংঘাতের ১৬তম দিন। এ যুদ্ধ নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই চাপের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন তার উপদেষ্টাদের কয়েকজন। তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের অনেকে প্রকাশ্যে এই যুদ্ধের সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। এ অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছেন ট্রাম্প।

এ যুদ্ধ শেষ করতে ইসরায়েলকে এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিকট ভবিষ্যতে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে ওয়াশিংটন। কারণ, ইরানে সরকার পতনের জন্য হয় সরাসরি বড় ধরনের স্থল অভিযান চালাতে হবে, নয়তো দেশ জুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভের প্রয়োজন হবে যার কোনোটিরই আপাতত লক্ষণ নেই।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের ফারাক দেখা  গেছে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজার ও তেলের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে এই সংঘাত শুরুর আগে এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে কোনো গভীর পর্যালোচনা করেনি। সংঘাত শুরুর পরপরই এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এক প্রতিবেদনে জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন এই লড়াইয়ের প্রভাবকে অনেকটা হালকাভাবে নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের আশ্বাসেও বিনিয়োগকারীরা শান্ত না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মজুদ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের দাবি, সামরিক অভিযানে তারা বড় সাফল্য পেয়েছে।

উভচর জাহাজে নতুন সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : চলমান যুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার মধ্যে প্রথমবারের মতো আড়াই হাজার মেরিন সেনার একটি দল উপসাগারে মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। জাপানের ওকিনাওয়ায় অবস্থিত নিজেদের ঘাঁটি থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা এখন যাত্রাপথে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’। এ যুদ্ধজাহাজ থেকেই মেরিন সেনারা সরাসরি রণক্ষেত্রে নামবেন। যুদ্ধের দুই সপ্তাহের মাথায় অঞ্চলটিতে এত সেনা ও উভচর জাহাজ মোতায়েন সংঘাতের তীব্রতা বাড়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো সংকট মোকাবিলা কিংবা ইরানের কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে।

খার্গ দ্বীপে কী ক্ষতি : যুক্তরাষ্ট্র শুক্রবার রাতে ইরানের কৌশলগত খার্গ দ্বীপে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে দেশটির নৌবাহিনীর মাইন সংরক্ষণাগার, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ বাংকারসহ ৯০টির বেশি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বীপে তেলের অবকাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে। তেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

মেরিন সেনা মোতায়েনের খবর আসার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প জানান, তার বাহিনী ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে থাকা সব সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খোলা না রাখলে এরপর খার্গের তেল স্থাপনায়ও হামলা হবে, বলেছেন তিনি।

তিন দেশে ইরানের হামলা : খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর উপসাগরীয় তিন দেশে দেশটির সামরিক ঘাঁটিতে ইরান একযোগে কয়েক দফা হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ-প্রধান অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরির দাবি অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির আল-ধাফরা, বাহরাইনের শেখ ঈসা ও কুয়েতে আল-আদিরি ঘাঁটিতে এসব  হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট রাডার ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং বিমানের জ্বালানি মজুদ রাখার ট্যাংক ছিল ওই হামলার লক্ষ্যবস্তু। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, খার্গ দ্বীপে হামলার পর আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সব গোপনীয় আস্তানা, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের উৎসস্থল, ব্যবহার করা বন্দর ও ডকসহ সৈন্যদের আস্তানাগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। বিবৃতিতে ইরান হামলার আগাম সতর্কতা জারি করে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর ও ফুজাইরাহ বন্দর এলাকার বাসিন্দাদের বন্দর, ডক ও মার্কিন স্থাপনা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহের ৫ বিমানে হামলা : সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর পাঁচটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান মাটিতে থাকা অবস্থায় সম্প্রতি হামলার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বিমানগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। কেউ নিহত হয়নি। বর্তমানে বিমানগুলো মেরামত করা হচ্ছে।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে গতকাল ড্রোন হামলা হয়েছে। তেল আবিব ও ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধ চায় হামাস : ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জবাবে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি গতকাল বলেছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আইন অনুসারে সব সম্ভাব্য উপায়ে আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার জন্য ইরানের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা এড়াতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। 

ভারত মহাসাগরে জাহাজে হামলার প্রতিশোধের হুমকি : ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি গতকাল শনিবার ঘোষণা দিয়েছেন যে ভারত মহাসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস দেনা’র ক্রুরা একটি শান্তিপূর্ণ মিশন শেষ করে ইরানে ফিরে আসছিল। সে সময় বিনা উসকানিতে জাহাজে হামলা চালিয়ে শতাধিক ক্রুকে হত্যা করা হয়। ইরান এ হামলার উপযুক্ত জবাব দেবে।   

জ্বালানি ট্যাংকারে ছাড় পেতে ইরানের কাছে ধরনা : জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা চেয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। এর মধ্যে ফ্রান্স, ইতালি ও ভারত রয়েছে। ভারতের দুটি ট্যাংকার গতকাল এ প্রণালী অতিক্রম করে দেশটির পশ্চিম উপকূল অভিমুখে রওনা হয়েছে।

চীনা মুদ্রায় ছাড় : আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরান একটি বড় পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর অংশ হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেনের মাধ্যমে তেল পরিবহন করা হলে সীমিত সংখ্যক তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। 

বিশ্ববাজারে অধিকাংশ তেল বিক্রি হয় মার্কিন ডলারে। তবে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনায় রুশ মুদ্রা রুবল অথবা চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার সম্প্রতি বেড়েছে।