বৈশ্বিক পানি সংকটের আসল রূপ

পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য মিঠাপানির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাবে বর্তমান বিশ্ব এক ভয়াবহ ওয়াটার ক্রাইসিস বা পানি সংকটের সম্মুখীন। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

পৃথিবীর উপরিভাগের প্রায় সত্তর শতাংশ জলরাশি দ্বারা আবৃত থাকলেও আমাদের ব্যবহারের উপযোগী মিঠাপানির পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। এই সামান্য পরিমাণ পানিই পৃথিবীর কয়েকশ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি, তাকে গবেষকরা গ্লোবাল ওয়াটার ক্রাইসিস বা বৈশ্বিক পানি সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইউনাইটেড নেশনস বা রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষ বর্তমানে নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকটে ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন সতর্কবাণী দিয়েছে যে, যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা পানির অভাবজনিত তীব্র চাপের মুখে পড়বে। এই সংকট কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং সম্পদের অসম বণ্টনের ফলেই ঘনীভূত হচ্ছে। পানির অভাব কেবল তৃষ্ণা মেটানোর সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি দেশের ইকোনমি বা অর্থনীতি, মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর আঘাত হানে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা

বিশ্বের জনসংখ্যা যে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানির চাহিদা। পপুলেশন গ্রোথ মানেই হলো কেবল পানের জন্য পানির প্রয়োজন নয়, বরং বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য অন্ন সংস্থানের প্রয়োজনে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া। অধিক জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে পৃথিবীতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, যার প্রতিটি ধাপে প্রচুর পরিমাণ ফ্রেশ ওয়াটার বা মিঠা পানি ব্যয় হয়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় বড় সিটি বা মেগাসিটিগুলোতে পানির সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আরবানাইজেশন বা নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং কংক্রিটের আধিক্যের কারণে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে শহরগুলোতে ওয়াটার টেবিল বা পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃতির বৈরিতা

পানির এই সংকটের পেছনে ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তন একটি ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর ন্যাচারাল ওয়াটার সাইকেল বা প্রাকৃতিক পানি চক্র বিঘ্নিত হচ্ছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি-র বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কোথাও হঠাৎ করে ফ্লাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী ড্রাউট বা খরার প্রকোপ বাড়ছে। হিমালয় বা আল্পস পর্বতমালার মতো বিশাল বিশাল গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সাময়িকভাবে বাড়লেও ভবিষ্যতে এগুলো পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেহেতু বিশ্বের একটি বড় অংশের কৃষি ও পানের পানি নদীর ওপর নির্ভরশীল, তাই হিমবাহ গলে যাওয়া মানেই হলো ভবিষ্যতে কয়েকশ কোটি মানুষের পানির উৎস হারিয়ে যাওয়া। এই পরিবর্তনের ফলে ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে।

ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার

আমরা বর্তমানে আমাদের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাই মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের মাধ্যমে। এই গ্রাউন্ড ওয়াটার বা ভূগর্ভস্থ পানি সাধারণত মাটির নিচে থাকা অ্যাকুইফার বা প্রাকৃতিক জলস্তরে জমা থাকে। কৃষি সেচ এবং কলকারখানার প্রয়োজনে আমরা যে হারে পানি তুলছি, প্রকৃতি সেই হারে তা রিচার্জ বা পুনরায় পূর্ণ করতে পারছে না। অনেক দেশে কৃষকরা ডিপ টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপ ব্যবহার করে এত বেশি পানি উত্তোলন করছেন যে, মাটির নিচের পাথুরে স্তরগুলো ধসে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। একবার যদি কোনো অ্যাকুইফার পুরোপুরি শুকিয়ে যায় বা তার গঠন নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা পুনরায় পানি দিয়ে পূর্ণ হতে শত শত বা হাজার বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রের নোনা পানি ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তরে মিশে যাচ্ছে, যাকে স্যালিনাইজেশন বলা হয়। এর ফলে উপকূলের মানুষের পানের যোগ্য পানি পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে এবং আবাদি জমিগুলো চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে।

পানিদূষণ

কেবল পানির পরিমাণ কমে যাওয়াই নয়, বরং বিদ্যমান পানির ওয়াটার কোয়ালিটি বা গুণগত মান নষ্ট হওয়াও একটি ভয়াবহ সমস্যা। ওয়াটার পলিউশন বা পানিদূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ। কলকারখানার অপরিশোধিত কেমিক্যাল ওয়েস্ট বা রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী এবং হ্রদে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এর পাশাপাশি প্লাস্টিক পলিউশন বা প্লাস্টিক দূষণ জলজ পরিবেশকে ধ্বংস করছে। কৃষিতে ব্যবহৃত পেস্টিসাইড বা কীটনাশক এবং ফার্টিলাইজার বা সার বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে, যা ইউট্রোফিকেশন নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয় এবং মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু ঘটায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সঠিক সুয়ারেজ সিস্টেম বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব থাকায় মানুষের বর্জ্য সরাসরি পানির উৎসে গিয়ে মিশছে, যার ফলে ডায়রিয়া ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। দূষণের কারণে আজ নদীর পানি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্বের মোট ব্যবহৃত মিঠাপানির প্রায় সত্তর শতাংশই ব্যয় হয় এগ্রিকালচার বা কৃষিকাজে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের ট্র্যাডিশনাল ইরিগেশন বা সনাতন সেচ পদ্ধতির কারণে এই পানির একটি বিরাট অংশ অপচয় হয়। ফ্লাড ইরিগেশন বা জমিতে সরাসরি পানি ভাসিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিতে উদ্ভিদের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পানি ব্যবহৃত হয়, যা শেষ পর্যন্ত ইভাপোরেশন বা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে উড়ে যায় অথবা ড্রেনেজ হয়ে নষ্ট হয়। আধুনিক প্রযুক্তির স্মার্ট ইরিগেশন বা ড্রিপ ইরিগেশনের মতো পদ্ধতিগুলো বিশ্বের সব প্রান্তে এখনো পৌঁছায়নি। যেখানে পানির সংকট বেশি, সেখানেও অনেক সময় পানির দক্ষ ব্যবহারের পরিবর্তে অপচয়ই বেশি দেখা যায়।

কৃষকদের মধ্যে ওয়াটার কনজারভেশন বা পানি সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা না থাকায় তারা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করে থাকেন। যদি কৃষিকাজে পানির ব্যবহার মাত্র দশ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়, তবে তা দিয়ে কোটি কোটি মানুষের পানের পানির অভাব মেটানো সম্ভব।

পানির সংকটের পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনাও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক দেশে পানি ব্যবস্থাপনা এখনো পুরনো অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ছিদ্রযুক্ত ও জরাজীর্ণ পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করার সময় বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি অপচয় হয়ে মাটির নিচে হারিয়ে যায়। অনেক শহরে পানির সরবরাহ ব্যবস্থা এতটাই অদক্ষ যে উৎপাদিত পানির একটি বড় অংশ ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে একদিকে পানির ঘাটতি বাড়ে, অন্যদিকে এই সীমিত সম্পদ নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া আন্তঃদেশীয় নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ আজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে উজানের দেশগুলো বড় বাঁধ, সেচ প্রকল্প বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে ভাটির দেশগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যায়। এতে কৃষি, পানীয় জলের সরবরাহ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে এসব দেশ নিজেদের পানির অধিকার রক্ষার জন্য কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে আফ্রিকার নীল নদের অববাহিকাকে উল্লেখ করা যায়। এই নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল কয়েকটি দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছে, বিশেষ করে ইথিওপিয়ার বৃহৎ বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এই নদী কয়েকটি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোটি মানুষের জীবন ও কৃষির সঙ্গে জড়িত।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যতে পানি নিয়ে সংঘাত শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত ও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এই পরিস্থিতিকে অনেক সময় ‘ওয়াটার ওয়ার’ বা পানিসংক্রান্ত সংঘাতের সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তাই এই সংকট মোকাবিলার জন্য কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক অবকাঠামো, স্বচ্ছ নীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃদেশীয় নদীগুলোর ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত পানি বণ্টন নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আঞ্চলিক সমঝোতা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও জটিল রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

টেকসই সমাধানের পথ

পানির অভাব সরাসরি ফুড সিকিউরিটি বা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানে। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ফসল উৎপাদন কমে যাবে, যার ফলে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যের দাম বাড়বে এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর পাশাপাশি হেলথ রিস্ক বা স্বাস্থ্যঝুঁকি তো রয়েছেই। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষ দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হবে, যা শিশুদের মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সাস্টেইনেবল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট বা টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। এছাড়া ওয়েস্ট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য পানিকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করার প্রক্রিয়াগুলো আরও উন্নত করতে হবে। ডিস্যালিনাইজেশন বা সমুদ্রের নোনা পানিকে মিষ্টি পানিতে রূপান্তর করার খরচ কমানো গেলে উপকূলীয় শহরগুলোর পানির চাহিদা সহজে মেটানো যাবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রায় পানির অপচয় রোধ করতে হবে এবং প্রতিটি ফোঁটা পানির গুরুত্ব বুঝতে হবে।

পানির অভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে যদি আমরা এখনই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিই। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইন এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে।