ত্বকী হত্যার ১৩ বছর

নতুন সংসদ দায় এড়াবে?

২০১৩ সালের ৬ মার্চ। নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে অপহৃত হয়েছিল মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। সে যাচ্ছিল সুধীজন পাঠাগারে। দুদিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি রাষ্ট্রের বিবেক সবকিছু যেন একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই ঘটনায়। সেই হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পার হলো। এই দীর্ঘ সময়েও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি। একটি হত্যা মামলার চার্জশিট পর্যন্ত আদালতে জমা না পড়া কেবল প্রশাসনিক বিলম্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। ঘটনার তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা কম ভয়াবহ নয়। মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন লিটন ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন ওসমান পরিবারের টর্চার সেলে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের ভাষ্যমতে, সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান।

২০১৪ সালে ওই সময় র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছিলেন। কিন্তু সেই ঘোষণার পরও, মামলার চার্জশিট আর জমা পড়েনি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে আছে। স্বভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্র কি সত্যিই এই হত্যার বিচার করতে চায় নাকি ক্ষমতার প্রভাবে বিচার প্রক্রিয়া বারবার আটকে যাবে? ত্বকী পরিবারের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, এই হত্যার নির্দেশদাতা শামীম ওসমান, যিনি বিগত জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। অর্থাৎ বিষয়টি এখন আর কেবল অতীতের কোনো অপরাধ নয়। এটি বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গেও নৈতিকভাবে জড়িয়ে আছে। এই কারণেই নতুন সংসদ এই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্বের প্রতীক। যদি সেই সংসদের সাবেক কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে একটি আলোচিত হত্যার নির্দেশদানের অভিযোগ থেকে যায় এবং রাষ্ট্র বছরের পর বছর বিচার শুরুই করতে না পারে, তবে সেটি কেবল বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা নয় রাষ্ট্রের নৈতিক সংকটও।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কিছু নয়। সরকার আসে, সরকার যায়। রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়। কিন্তু যদি বিচারহীনতা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেই পরিবর্তনের তাৎপর্য কতটা? ত্বকী হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ১৩ বছর ধরে ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন মানুষরা প্রতিমাসের ৮ তারিখ মোমবাতি হাতে আলোকপ্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করেন। এটি শুধু একটি পরিবারের শোক প্রকাশ নয়, রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেওয়ার এক নাগরিক উদ্যোগ একটি হত্যার বিচার এখনো বাকি। এই দীর্ঘ সময়ে বিচার চাওয়ার কারণে আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছে হয়রানি ও দমন-পীড়ন। মিথ্যা মামলা, আইনি চাপ, হুমকি সবকিছুর মধ্যেও আন্দোলন থামেনি। বরং দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে। খুনের কোনো প্রতিস্থাপন হয় না। ক্ষতিপূরণ বা বক্তব্য দিয়ে মা-বাবাকে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া যায় না। এরপরও বিচার প্রয়োজন। কারণ বিচার মানে প্রতিশোধ নয়। ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করার জন্যই বিচার হওয়া দরকার। বিচার একটি ঘোষণা যে সমাজে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। ১৩ বছর পর এসে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হচ্ছে ত্বকী হত্যার বিচার কি সত্যিই হবে কিনা, নাকি দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও দীর্ঘ হবে?খুনের দায় অবশ্যই খুনির। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের। সেই দায় নতুন সংসদও পাশ কাটাতে পারে না। 

লেখক : কবি ও সাংবাদিক