৬২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা

মাছ রপ্তানি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে তা চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ ঘিরে। এসব মাছের উৎপাদন বা সংগ্রহ বাড়ানোর পাশপাশি প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি আয় বাড়ানোই এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। এজন্য সরকার ৫০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা তৈরি করছে, যা বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার পড়বে ৬২ হাজার কোটি টাকা; যা সরকারি, বেসরকারি এবং দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায়, মৎস্য অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছে। পরিকল্পনাটি ২০২৫ থেকে ২০৭৫ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনটি ধাপে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ঠিকঠাক পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে পারলে নির্দিষ্ট সময় পর থেকে প্রতি বছর রপ্তানির মাধ্যমে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

জানা যায়, কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত সরকারি চিংড়ি এস্টেট ও সংলগ্ন এলাকা ঘিয়ে এই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে চিংড়ি এস্টেটের (সরকারি) ৭ হাজার একর মূল জমি এবং এই এস্টেট সংলগ্ন আরও ২১ হাজার একর এলাকায় সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সামুদ্রিক মৎস্য চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা হবে। এজন্য জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও সহায়ক অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে।

এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাঁধ, যাতায়াতের জন্য সড়ক, ফিশ ল্যান্ডিং স্টেশন, বরফ কল ও ফিশ ফিড কারখানা, আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণন কেন্দ্র ও ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পর্যটন বিকাশের জন্য তৈরি হবে একটি ইকো পার্ক। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হবে বাঁধসংলগ্ন এলাকায়।

সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মনীষ কুমার ম-ল বলেন, বিশাল এলাকা জুড়ে একটি বিশাল কর্মকা-ের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই রপ্তানি জোনে নানা ধাপে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এখানে সরকারি ও বেসরকারি পার্টনারশিপ, বিদেশিদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগেরও সুযোগ রাখা হয়েছে।

জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি এবং যৌথভাবে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদিত পরিমাণও ঠিক করা হয়েছে এ পরিকল্পনায়। বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী একেবারেই প্রথম ধাপে উৎপাদন ৭১৫ টন, দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ৪ হাজার ২২৪ টন এবং তৃতীয় ধাপে উৎপাদন ১১ হাজার ২৫৯ টন। উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হবে রপ্তানি। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতি বছরই মোট উৎপাদন বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক অবস্থায় হেক্টরপ্রতি মাছের উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ১ টন ধরা হলেও সেটা ২০৫০ সালের মধ্যে ৫ টন ছাড়িয়ে যাবে বলেও পরিকল্পনায় তুলে আনা হয়েছে।

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, মৎস্য চাষ, প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ, ইকো-ট্যুরিজম এবং পরিষেবা খাতে এখানে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রথম ধাপের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে ২০৩১ থেকে ২০৪৫ সময়ে এবং তৃতীয় ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে ২০৪৬ থেকে ২০৭৫ সালের মধ্যে।

জানা গেছে, এ পরিকল্পনার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে চিৎড়ি মাছের উৎপাদন ও রপ্তানি। এখানে সরকারি-বেসরকারি এবং জয়েন্ট ভেঞ্জারের মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক মাছের ক্রেতা দেশগুলো যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আর জয়েন্ট ভেঞ্জারের বিনিয়োগের সুবিধাগুলোর মধ্যে থাকবে বৈশি^ক বাজার যেমন ওয়ালমার্ট, কেরিফোরের মতো চেইন শপগুলোতে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হবে। থাকবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা। বৈশি^ক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয় চুক্তির পরিকল্পনাও রয়েছে এতে।

পরিকল্পিত এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মানুষের বসবাসের সুযোগও তৈরি করা হবে। বসবাসকারীদের যাতায়াত ব্যবস্থা সহজীকরণের জন্য চৌফলদীতে মাতামুহুরী নদীর ওপর একটি নতুন সেতু প্রস্তাব করা হয়েছে, যার সঙ্গে একটি পেরিফেরাল ডাইক-রোড থাকবে; যা প্রাথমিকভাবে ২৬ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ বছরের মধ্যে ১১০ কিলোমিটারে উন্নীত হবে। এস্টেটটি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জাতীয় রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সংযুক্ত থাকবে, যা এটিকে একটি প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে। সমান্তরালভাবে, মৎস্য চাষ এবং পূর্ব-সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সহায়তা করার জন্য ব্রডব্যান্ড, মোবাইল টাওয়ার এবং এস্টেটব্যাপী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারিত করা হবে।

এ পরিকল্পনাটি ৩০ কিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বেল্ট পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। বৃহৎ পরিসরে উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করবে। বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা এবং বর্জ্য-মূল্য-পুনর্ব্যবহার পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করবে। এস্টেটের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলারও ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

মনীষ কুমার ম-ল বলেন, সামুদ্রিক মৎস্য চাষ আধুনিকীকরণই হবে উৎপাদন কার্যক্রমের মূল ভিত্তি। সনাতন উৎপাদন থেকে আধা-নিবিড় এবং নিবিড় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এটি করতে গিয়ে বিদ্যমান পুকুর সংস্কার করা হবে, আধুনিক হ্যাচারি, ফিড মিল, ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি এবং রোগ নজরদারি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।