পৃথিবীর মানচিত্রে অদ্ভুত বৈপরীত্য চলছে। পৃথিবীর মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে ধ্বংসের আগুন, রক্তের দাগ আর যুদ্ধছায়া। প্রশ্ন জাগে, বিশ্বশান্তির জন্য প্রতিষ্ঠিত সেই বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘের ভূমিকা কোথায়? যে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বিশ্বমানবতার অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরে, সেই প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে পারছে? নাকি পরিণত হয়েছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক নাট্যমঞ্চে? বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা যেন সেই প্রশ্নকে আরও তীক্ষè করে তুলেছে। বিশ্ব জুড়ে দেশে দেশে যুদ্ধ বিভিন্ন প্রশ্নকে উসকে দিচ্ছে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংঘাত বিশ্ব বিবেককে বারবার নাড়া দিয়েছে। গাজা উপত্যকা একের পর এক বোমা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, লাখ লাখ মানুষ ঘরহারা হয়েছে। শিশুদের কান্না, হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষ, খাদ্য ও পানির সংকট সব মিলিয়ে সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার জন্য এক নির্মম প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই ভয়াবহতার মধ্যেও বিশ্বশক্তিগুলোর অবস্থান বিভক্ত। কেউ শুধু নিন্দা জানিয়েছে, কেউ সমর্থন দিয়েছে আবার কেউ নীরবতা বজায় রেখেছে। আর এসব কিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত ছিল, সেই প্রতিষ্ঠান যেন কেবল উদ্বেগ প্রকাশের ভাষায় সীমাবদ্ধ থেকেছে।
রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করেছে। ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় দেশের শহরে মিসাইল হামলা, অবকাঠামো ধ্বংস, শরণার্থীর ঢল সব মিলিয়ে এটি ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে অন্যতম বড় সংকট। পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে, রাশিয়া তার সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে আর বিশ্ব রাজনীতি নতুন এক শীতল যুদ্ধের আবহে প্রবেশ করেছে। এই সংঘাতের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার পর আলোচনা হয়েছে, নিন্দা প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ থামানোর মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। সীমান্তে গোলাগুলি, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পুরো অঞ্চলকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা এখন আর কেবল ত্রিমাত্রিক যুদ্ধের পর্যায়ে নেই; বলা চলে এটি ধীরে ধীরে এক পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বহু বছর ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যে গোপন সংঘাত চলছিল, তা এখন প্রকাশ্য ও সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত, সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে আক্রমণ এবং পাল্টা প্রতিশোধমূলক অভিযানের মাধ্যমে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে বিপজ্জনক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত জোট এই সংঘাতকে কেবল আঞ্চলিক সীমার মধ্যে রাখেনি; বরং তা বৈশ্বিক শক্তির সংঘর্ষের মাত্রায় রূপান্তর করেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং পারস্য উপসাগর ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ এক জটিল বহুমাত্রিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংঘাত বিশ্লেষণ করলে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশ্বব্যবস্থা আজ গভীরভাবে বিভক্ত। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, আর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাস্তবতার মধ্যে কার্যত সীমাবদ্ধ। ফলে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে, বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত সেই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি কি সত্যিই তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে? জাতিসংঘের কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে সমালোচনা রয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা। পাঁচটি রাষ্ট্রের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকার কারণে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রায় সময়ই রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়। অনেকের মতে, এই কাঠামো মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলন, যা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যখন কোনো ছোট রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করে, তখন দ্রুত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে একই নিয়ম সবসময় কার্যকর হয় না। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, অস্ত্রের বাজার হয় তত বড়। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশি^ক অর্থনীতির একটি অংশ যুদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে শান্তির আহ্বান যতই উচ্চারিত হোক না কেন, বাস্তব রাজনীতিতে যুদ্ধ অনেক সময় লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা যেন এক অদ্ভুত দ্বিধার মধ্যে আটকে গেছে। বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু যখন যুদ্ধ থামানোর প্রশ্ন আসে, তখন এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববাসীর মনে এক ধরনের হতাশা জন্ম নিচ্ছে। এই বাস্তবতায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, জাতিসংঘ কি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে? নাকি এটি এমন একটি কাঠামোর মধ্যে বন্দি, যেখানে প্রকৃত পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব? ২০২৬ সালের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, আবারও সেই প্রশ্নটি ফিরে আসে জাতিসংঘ নামের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কাজ কী? এটি কি বিশ্বশান্তির রক্ষক, নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত একটি প্রতীকী কাঠামো? মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে আছে। যদি বিশ্ব সত্যিই যুদ্ধমুক্ত একটি ভবিষ্যৎ চায়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষক
sultanmh17@gmail.com