টেক জায়ান্টদের সামরিক প্রযুক্তি

বর্তমান বিশ্বের টেক জায়ান্ট স্যামসাং, হুন্দাই বা মিতসুবিশি কেবল ঘরোয়া গ্যাজেট বা গাড়ি নির্মাতাই নয়, বরং পর্দার আড়ালে তারা প্রতিরক্ষা খাতের প্রধান কারিগর। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

আমরা যখন প্রতিদিনের জীবনে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য বা শৌখিন গ্যাজেট ব্যবহার করি, তখন সেগুলোর পেছনের লোগোটি আমাদের কাছে কেবলই একটি ব্র্যান্ডের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এই পরিচিত নামগুলোই পর্দার আড়ালে পালন করে এক ভয়ংকর এবং শক্তিশালী ভূমিকা। স্মার্টফোন, এসি বা বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা হিসেবে আমরা যাদের চিনি, তাদের কারিগরি গবেষণাগারে তৈরি হয় এমন সব প্রযুক্তি যা মুহূর্তেই যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। শান্তির সময়ে যারা মানুষের জীবনকে সহজ করতে চিপসেট বা ইঞ্জিন বানায়, সংকটের মুহূর্তে তারাই আবার তাদের মেধা ও শ্রম নিয়োগ করে ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষা খাতের দুর্ভেদ্য সব সিস্টেম তৈরিতে। আমরা যখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে স্যামসাংয়ের বড় পর্দায় সিনেমা দেখি বা হাতে থাকা স্মার্টফোনে স্ক্রল করি, তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারি না যে এই লোগো লাগানো কোম্পানিটি এক সময় রণক্ষেত্রে শত্রু নিধনের ভয়ংকর সব মারণাস্ত্র তৈরি করত। দক্ষিণ কোরিয়ার এই শিল্পগোষ্ঠী কেবল চিপসেট বা ডিসপ্লে তৈরিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তাদের স্যামসাং টেকউইন নামক একটি বিশেষ শাখা ছিল যা দশকের পর দশক সামরিক প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের সবচেয়ে আলোচিত উদ্ভাবন ছিল এসজিআর এ ওয়ান নামক একটি স্বয়ংক্রিয় রোবট সেন্ট্রি বা প্রহরী। এটি কেবল একটি সাধারণ মেশিনগান নয়, বরং এতে যুক্ত ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা নির্দিষ্ট দূরত্বে মানুষের উপস্থিতি বা নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে এই রোবটগুলো মোতায়েন করা হয়েছিল যা দিনের আলোতে তো বটেই, এমনকি ঘন কুয়াশা বা ঘুটঘুটে অন্ধকারেও ইনফ্রারেড সেন্সর এবং নাইট ভিশন ক্যামেরার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম। যদিও স্যামসাং পরে তাদের এই ডিফেন্স শাখাটি হানিওয়া গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়, তবুও তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধের ময়দান নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের তৈরি কে নাইন থান্ডার নামক সেলফ প্রপেলড হাউইটজার বা স্বচালিত কামানটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সফল আর্টিলারি সিস্টেম হিসেবে পরিচিত যা এখন নরওয়ে, পোল্যান্ড এবং ভারতের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর প্রধান হাতিয়ার।

হুন্দাই ও মিতসুবিশি

হুন্দাই মানেই যে কেবল পারিবারিক ব্যবহারের আরামদায়ক গাড়ি এই ধারণাটি আমাদের খ-িত সত্য দেখায়। হুন্দাই রোটেম নামক তাদের যে বিশেষ বিভাগটি রয়েছে, সেটি মূলত ভারী যুদ্ধাস্ত্র এবং সাঁজোয়া যান তৈরিতে বিশ্বসেরা। তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্যের নাম হলো কে টু ব্ল্যাক প্যানথার। এই ট্যাংকটি আধুনিক যুগের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন। এতে রয়েছে এমন এক স্বয়ংক্রিয় সেন্সর সিস্টেম যা শত্রুপক্ষের ছোঁড়া মিসাইল বা রকেট মাঝপথেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ট্যাংকের গোলার নিখুঁত লক্ষ্যভেদ এবং এর উচ্চগতির কারণে এটি বর্তমানের গ্লোবাল ডিফেন্স মার্কেটে সবচেয়ে দামি এবং শক্তিশালী ট্যাংকের মর্যাদা পেয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের সময় রসদ সরবরাহ করার জন্য তারা এমন সব হেভি ডিউটি ট্রাক এবং সাঁজোয়া যান তৈরি করে যা মাইলের পর মাইল দুর্গম মরুভূমি বা তুষারাবৃত পাহাড়েও সমান তালে চলতে পারে। অন্যদিকে জাপানের মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমএইচআই তাদের সাবমেরিন এবং যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে এশিয়ার শক্তি ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই কিংবদন্তি জিরো ফাইটার তৈরির ঐতিহ্যকে ধরে রেখে তারা এখন জাপানের জন্য এফ টু ফাইটার জেট এবং আধুনিক তাইগেই ক্লাস সাবমেরিন তৈরি করছে যা জলের নিচে নিঃশব্দে বিচরণ করে শত্রুপক্ষের রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। মিতসুবিশির মহাকাশ প্রযুক্তি বিভাগটি আবার উন্নত রকেট লঞ্চার এবং মিসাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমেও কাজ করে যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বোয়িং ও এয়ারবাস

বোয়িং এবং এয়ারবাস নাম দুটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় মূলত প্যাসেঞ্জার বিমান বা কমার্শিয়াল ফ্লাইটের মাধ্যমে হলেও এদের আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে প্রতিরক্ষা বা ডিফেন্স খাত থেকে। বোয়িং কেবল বিমান বানায় না, তারা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং নজরদারি স্যাটেলাইট তৈরিতেও অগ্রগামী। এফ ফিফটিন ইগল বা এফ এ এইটিন সুপার হরনেটের মতো বিধ্বংসী ফাইটার জেটগুলো বোয়িংয়ের কারখানাতেই প্রাণ পায়। এছাড়া বর্তমানের ডমিন্যান্স ওয়ারফেয়ারে ড্রোনের গুরুত্ব অপরিসীম এবং বোয়িং তাদের বিভিন্ন ড্রোন প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতে চালকবিহীন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একইভাবে এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস বিভাগটি সামরিক পরিবহনের জন্য এ ফোর হান্ড্রেড এম-এর মতো বিশাল কার্গো বিমান তৈরি করে যা আস্ত একটি ট্যাংক নিয়ে উড়ে যেতে পারে। তাদের তৈরি ইউরোপিয়ান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক কেবল যোগাযোগ রক্ষা করে না, বরং হাই রেজোলিউশন ইমেজিং বা ছবির মাধ্যমে শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি চালায়। এই কোম্পানিগুলো প্রমাণ করে যে সাধারণ ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং মারণঘাতী সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্যই। অনেক ক্ষেত্রে সিভিল এয়ারক্রাফটের বডি বা কাঠামো ব্যবহার করেই তারা গোয়েন্দা বিমান বা এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম তৈরি করে থাকে যা আধুনিক আকাশ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

রোলস রয়েস

রোলস রয়েস বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আভিজাত্য এবং রাজকীয় জীবনযাত্রার প্রতীক একটি গাড়ি। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে বিএমডব্লিউ যখন গাড়ির ব্র্যান্ডটির মালিকানা ধরে রেখেছে, তখন মূল রোলস রয়েস হোল্ডিংস মনোযোগ দিয়েছে আকাশ এবং সমুদ্রের গভীরতায়। তারা মূলত জেট ইঞ্জিন এবং নিউক্লিয়ার প্রপালশন বা পারমাণবিক শক্তিচালিত ইঞ্জিনের জন্য বিখ্যাত। ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো চলে তাদের তৈরি পারমাণবিক চুল্লির শক্তিতে যা জ্বালানি না ভরেই বছরের পর বছর সাগরের তলদেশে থাকতে পারে। এছাড়া ইউরোফাইটার টাইফুন বা এফ থার্টি ফাইভ-এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের ভেতরে থাকে রোলস রয়েসের কারিগরি শ্রেষ্ঠত্ব। অন্যদিকে আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক বা জিই কেবল বৈদ্যুতিক বা গৃহস্থালি পণ্য বানায় না, বরং তারা বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। এফ সিক্সটিন ফাইটিং ফ্যালকন-এর মতো কিংবদন্তি যুদ্ধবিমানের হৃদপি- হলো তাদের তৈরি এই জেট ইঞ্জিন। তাদের এভিয়েশন বিভাগটি এমন সব থার্মাল ইমেজিং এবং রাডার সেন্সর তৈরি করে যা দিয়ে হাজার মাইল দূর থেকে আসা শত্রু বিমানের অবস্থান বা গতিপথ সহজেই বলে দেওয়া সম্ভব। এই ইঞ্জিনগুলো কেবল আকাশেই নয়, বড় বড় নৌযানেও টারবাইন হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা সামরিক বহরকে দ্রুতগতিতে শত্রুর সীমানায় পৌঁছে দেয়।

ডুয়াল ইউজ প্রযুক্তি

আধুনিক যুদ্ধের ময়দান এখন আর শুধু পেশিশক্তি বা কামানের গোলার ওপর টিকে নেই, বরং এটি এখন চিপসেট এবং সফটওয়্যারের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এখানেই স্যামসাং বা জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো কোম্পানিগুলোর আসল ক্ষমতা প্রকাশ পায়। তারা যেসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য বানায়, সেগুলোকেই সামান্য রদবদল করে সামরিক কাজে ব্যবহার করা হয় যেটিকে বলা হয় ডুয়াল ইউজ টেকনোলজি। যেমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আমাদের ছবির সৌন্দর্য বাড়ালেও রণক্ষেত্রে এটি ড্রোনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নির্ভুল আঘাত হানতে সাহায্য করছে। একইভাবে ফাইভ জি বা পরবর্তী প্রজন্মের ইন্টারনেট প্রযুক্তি সেন্সরগুলোকে রিয়েল টাইম ডেটা বা তাৎক্ষণিক তথ্য দিয়ে যুদ্ধের ময়দানে জেনারেলদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। বর্তমানে সাইবার ডিফেন্স বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত যুদ্ধও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যেখানে মাইক্রোসফট বা আমাজনের মতো কোম্পানিগুলো ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডেটা স্টোরেজের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করছে। তাই এই বড় বড় টেক জায়ান্টরা সরাসরি অস্ত্র না বানালেও তাদের তৈরি মেমোরি চিপ, রাডার সেন্সর এবং উন্নত মেকানিক্যাল ইঞ্জিন ছাড়া আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কল্পনা করাই অসম্ভব। তারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে যতটা আধুনিক করেছে, ঠিক ততটাই শক্তিশালী করেছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা বা ধ্বংসের অবকাঠামোকে যা এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার জন্ম দেয়।

বর্তমান পৃথিবীতে বেসামরিক এবং সামরিক প্রযুক্তির মধ্যকার যে সূক্ষ্ম সীমারেখা এক সময় বিদ্যমান ছিল তা এখন পুরোপুরি আবছা হয়ে এসেছে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে হাই অ্যান্ড গেমিং ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন ব্যবহার করি তার ভেতরে থাকা প্রসেসর আর একটি আধুনিক ড্রোন কিংবা মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেমে ব্যবহৃত চিপের মধ্যে গুণগত পার্থক্য এখন নামমাত্র। এই বিশাল টেক জায়ান্ট এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশনগুলো তাদের ডুয়াল ইউজ টেকনোলজির মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অভাবনীয়ভাবে আধুনিক ও সহজতর করছে অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রগুলোর সামরিক শক্তিকে করে তুলছে অপ্রতিরোধ্য ও বিধ্বংসী। যদিও অনেক সময় নৈতিকতা বা হিউম্যানিটারিয়ান গ্রাউন্ডে এই কোম্পানিগুলোর সমরাস্ত্র নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয় কিন্তু রূঢ় বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দৌড়ে তারা একেকজন অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই কোম্পানিগুলো তাদের গবেষণাগারে প্রতিনিয়ত যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স নিয়ে কাজ করছে তা কেবল আমাদের ঘরের কাজ সহজ করছে না বরং রণক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প হিসেবে স্বয়ংক্রিয় ঘাতক বাহিনী তৈরি করছে।

প্রযুক্তির এই বিশাল মহাযজ্ঞে আমরা যারা সাধারণ ব্যবহারকারী তারা হয়তো কেবল হাতের ডিভাইসের বাহ্যিক চটক বা তার কার্যকারিতাটুকুই দেখি কিন্তু তার গভীর স্তরে লুকিয়ে থাকা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এই লড়াইটিই আসলে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ক্ষমতার আসল মানদ- ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যখন একটি স্মার্টফোন কোম্পানি তাদের সেন্সর প্রযুক্তিতে উন্নতি ঘটায় তখন পরোক্ষভাবে সেই একই প্রযুক্তি কোনো এক যুদ্ধবিমানের রাডারে যুক্ত হয়ে সেটিকে আরও নিখুঁত করে তোলে। এই যে প্রযুক্তির দ্বৈত ব্যবহার তা সমাজকে একদিকে যেমন অগ্রগতির শিখরে নিয়ে যাচ্ছে আবার অন্যদিকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও ধ্বংসের সক্ষমতাও মানুষের হাতের নাগালে এনে দিচ্ছে।