ধন্যবাদে সিক্ত হয়ে লিপুর বিদায়

নির্বাচকের কাজটাকে বলা হয় থ্যাঙ্কসলেস জব। একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের জন্য নির্বাচন করেন নির্বাচকরা, তবে মাঠে খেলে একজন খেলোয়াড়কেই দিতে হয় প্রমাণ। খেলোয়াড় ভালো করলে কৃতিত্ব তার আর খারাপ করলে সুযোগ দেওয়ার জন্য দোষ হয় নির্বাচকের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বহুল বিস্তারের ফলে দোষারোপটা অনেক সময়ই শোভনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচকের জায়গাটা ২৫ মাস ধরে অলংকৃত করে রেখেছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে অধিনায়ক, জাতীয় দলের সাবেক ম্যানেজার ও বোর্ড পরিচালক লিপু দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, তার চুক্তির মেয়াদ ছিল দুই বছর। ব্যক্তিগত কারণে মেয়াদপূর্তির পর আর দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনে আগ্রহ দেখাননি লিপু, বিসিবিও তাই তার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে খোঁজ করেছে নতুন নির্বাচকের। ৩১ মার্চ শেষ হচ্ছে লিপুর মেয়াদ, এই সময়ে আর কোনো খেলা নেই জাতীয় দলের। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই শেষ হয়েছে তার প্রধান নির্বাচক জীবন, যে সিরিজটা বাংলাদেশ জিতেছে ২-১ ব্যবধানে। তৃতীয় ওয়ানডের পর ড্রেসিংরুমে দলের সদস্যরা মিলে জার্সি উপহার দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দিলেন লিপুকে।

ওয়ানডে দলে কাকতালীয়ভাবে বাকি দুই সংস্করণের দুই অধিনায়ক, নাজমুল হোসেন শান্ত এবং লিটন দাসও আছেন। মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে এই দুজনও লিপুর বিদায় বেলায় তাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। মিরাজ বলেছেন, ‘আপনি চেষ্টা করেছেন সেরা দলটা গড়ার জন্য। আমি খুবই খুশি ছিলাম আপনার ওপর ম্যানেজমেন্ট বলেন, প্লেয়ার বলেন। আমি অনেক সময় ইয়ে (অখুশি) ছিলাম কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে, কিছু প্লেয়ার নিয়ে, আপনি সবসময় ভালোটা করার চেষ্টা করেছেন দলের ভালোর জন্য, এখানে ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ বা ইয়ে (উদ্দেশ্য) ছিল না।’ টেস্ট অধিনায়ক শান্ত বলেছেন, ‘নির্বাচকের সঙ্গে সবসময় একটা সুস্থ বিতর্ক চলতেই থাকে। যেটা আমাদের ছিল, এই তর্কটা আমি সবসময় উপভোগ করতাম। যে তর্কটাই হতো সেটা হতো বাংলাদেশ দলের জন্য। দল কীভাবে ভালো করবে, দলের কোনো সমন্বয় দরকার এলে, ব্যাপারটা খুব চমৎকার ছিল, আমি খুব উপভোগ করেছি আপনার সঙ্গে কাজ করাটা। আপনার আগামীর দিনগুলোর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আপনি যেখানেই যাবেন আশা করি আপনি আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।’

টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস হয়তো লিপু সম্পর্কে একটু ভিন্ন ধারণাই পোষণ করতেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের টি-টোয়েন্টি দল থেকে শামীম হোসেন পাটোয়ারীকে বাদ দেওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যেই লিপুর সমালোচনা করেছিলেন লিটন। লিপু দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচের দল থেকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রামের হোটেল থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল লিটনকে। সেই লিটন লিপুর বিদায় বেলায় বলেছেন, ‘আপনার যদি কোনো ইনফরমেশন থাকে, অবশ্যই আমাদের ফোন অ্যাভেইলেবল, আপনার টেক্সট অথবা ফোন কলের জন্য আমরা ওয়েট করব।’

ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির প্রধান নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেছেন, ‘আপনারা সাফল্যের যে ধারা দেখছেন, তা এমনি এমনি আসেনি। আপনাদের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা ছিল, যা আমাদের একবিন্দুতে নিয়ে এসেছে এবং যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই আজ আমরা আপনাদের এই জয় দেখতে পাচ্ছি।’

বিদায়ী বক্তব্যে লিপু বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই আপনাদের খেলা দেখব, ক্রিকেট আমারও প্যাশনের জায়গা। জয় দিয়ে দায়িত্বটা শেষ করতে পেরে ভালো লাগছে। আপনারা আমাকে সেই গর্ব করার সুযোগটা দিয়েছেন, এজন্য আমি খুবই খুশি। কোচ, খেলোয়াড়, ম্যানেজমেন্ট সবাইকে ধন্যবাদ, অধিনায়ককেও বিশেষ ধন্যবাদ। আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে সামনের দিকে দলকে নিয়ে যাওয়া। সব সংস্করণে দলকে আরও সাফল্য এনে দেওয়া। আমি অবশ্যই আপনাদের খেলা দেখব। আপনাদের নিয়ে কথা বলব, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। দলে কেউ ঢুকবে, কেউ বাদ যাবে, এটাই রীতি। কেউ মনে কষ্ট পুষে রাখবেন না।’

লিপুর সঙ্গে নির্বাচক হিসেবে যোগ দিলেও পরে দায়িত্ব ছেড়ে কোচিংয়ে মনোনিবেশ করেন হান্নান সরকার। দেশ রূপান্তরকে জানালেন লিপুর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা, ‘লিপু ভাই খুব গুছিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। একজন খেলোয়াড়কে খুব বিশদভাবে জানা, তার ব্যাপারে ভালোভাবে জানা, দলে তার ভূমিকা কী হবে, দলীয় সমন্বয়টা কী হবে সবকিছু ভালোভাবে জেনে তারপরে সিদ্ধান্ত নিতেন। আমি আর লিপু ভাই একই সঙ্গে নির্বাচক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, তাই আগের কারও সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই যে তুলনা করব। ওনার ব্যাপারে এটাই বলতে পারি যে, উনি সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে পছন্দ করতেন।’

আব্দুর রাজ্জাক নির্বাচক পদ থেকে সরে বিসিবির পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, লিপুও মেয়াদ পূর্ণ করে বিদায় নিচ্ছেন। নির্বাচক পদে আছেন শুধু হাসিবুল হোসেন। এরই মধ্যে নির্বাচক চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে সাক্ষাৎকার গ্রহণ পর্বও শুরু করেছে বিসিবি। প্রধান নির্বাচক পদে হাবিবুল বাশার আসছেন, জোরালো খবর এমনটাই। তার সঙ্গে নির্বাচক পদে শোনা যাচ্ছে নাঈম ইসলাম এবং জাভেদ ওমর বেলিমের নামটাও।