হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে ইরানের অনুমতি পেল যারা

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর বাইরে কিছু দেশের জাহাজকে সীমিতভাবে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, গত ২ মার্চ হরমুজ প্রণালী ‘বন্ধ’ ঘোষণা করেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান উপদেষ্টাদের একজন ইব্রাহিম জাবারি। কোনো জাহাজ জোর করে প্রবেশের চেষ্টা করলে তা পুড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল ৬৫ ডলার।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, কয়েকটি দেশ তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচলের অনুমতি চেয়ে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিছু দেশের জাহাজকে এরই মধ্যে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও সুনির্দিষ্ট দেশ বা সংখ্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

যেসব দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেয়েছে

পাকিস্তান: গত রবিবার 'করাচি' নামের পাকিস্তানি পতাকাবাহী তেলবাহী একটি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

ভারত: ভারতের ক্ষেত্রেও কয়েকটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শনিবার ইরানে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাত্তাহালি জানান, কয়েকটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ পার হতে দেওয়া হয়েছে। একই দিনে ভারত জানায়, তাদের দুটি গ্যাসবাহী জাহাজ নিরাপদে প্রণালী পার হয়ে দেশের পথে রয়েছে।

তুরস্ক: তুরস্কের একটি জাহাজও ইরানের অনুমতি নিয়ে প্রণালী পার করেছে। দেশটির পরিবহনমন্ত্রী আব্দুলকাদির উরালওগলু জানান, ইরানি বন্দর ব্যবহার করার বিশেষ অনুমতি নিয়ে একটি জাহাজকে প্রণালী পার করা হয়েছে। আরও কয়েকটি জাহাজ অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।

চীন: চীনের তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল চীন এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির প্রায় ৪৫ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।

ফ্রান্স ও ইতালি: ইউরোপের দেশ ফ্রান্স ও ইতালিও তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত রবিবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ওই এলাকায় জাহাজ পাঠাবে। এতে করে হরমুজ প্রণালী আর কোনো দেশের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে না বলে দাবি করেন তিনি।

তবে ট্রাম্প যেসব দেশের নাম উল্লেখ করেছেন, তাদের কেউই এখন পর্যন্ত এ ধরনের নৌজোটে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

সোমবার জার্মানি ও গ্রিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে না। জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র জানান, যুদ্ধ চলাকালে তারা হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার কোনো সামরিক উদ্যোগে যুক্ত হবে না। একই অবস্থান জানিয়েছে গ্রিস।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বলেছেন, তারা এই সংঘাত আরও বিস্তৃত করতে চান না এবং বড় পরিসরের যুদ্ধে জড়াতে রাজি নন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করায় তারা এমন নৌজোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রডজার শানাহান বলেন, এই প্রস্তাবে মিত্রদের সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ছাড়া বাস্তবিক দিক থেকে দ্রুত এ ধরনের নৌবাহিনী মোতায়েন করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। রডজার শানাহান জানান, দূরবর্তী অঞ্চল হওয়ায় জাহাজ সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।