ঈদযাত্রায় নৌঘাটে নৈরাজ্য

পবিত্র ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তেই ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাটে সৃষ্টি হয়েছে বিশৃঙ্খলা। শৃঙ্খলার অভাব এবং নজরদারির ঘাটতির কারণে যাত্রীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু পরিবহনচালক ও দালালচক্র যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।

এদিকে পাটুরিয়া ঘাটে যাত্রীবাহী পরিবহনের চালক ও স্টাফদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠেছে। স্থানীয়ভাবে ‘ঘাট সুপারভাইজার’ পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে প্রতি গাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।

আমাদের ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাটে নৌযান চলাচলে কোনো নির্ধারিত শৃঙ্খলা মানা হচ্ছে না। যাত্রী ওঠানামার জন্য নেই সঠিক ব্যবস্থাপনা। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলার। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

শুধু নদীপথ নয়, ঘাটসংলগ্ন সড়কেও একই চিত্র। সিএনজি, অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকরাও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু ও বয়স্কযাত্রীরা।

স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের তদারকির অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ তাদের। এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যাত্রীদের দাবি, ঈদযাত্রা নির্বিঘœ ও নিরাপদ করতে দ্রুত তদারকি বাড়ানো এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

 সচেতন মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে ভোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ অনেক বেড়েছে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। সারা দিনই আমাদের নজরদারি রয়েছে, আমিও কয়েক ঘণ্টা ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ কিছু পাওয়া যায়। তবে অনেক সময় যাত্রীরাই তাড়াহুড়ার কারণে বেশি ভাড়া দিয়ে দেন। নির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন গাড়ি বা কারা ভাড়া বেশি নিচ্ছে তা স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।’

ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, ভোলা সদর ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে আসা কিছু যানবাহন একমুখী যাত্রী পরিবহন করায় ফেরার নিশ্চয়তা না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপের কারণে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অনিয়ম ঘটলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’

পাটুরিয়া ঘাটে চাঁদাবাজি : ঈদ কেন্দ্র করে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাট। তবে এই ব্যস্ততার মাঝেই ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন রুট থেকে আসা যাত্রীবাহী পরিবহনের চালক ও স্টাফদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়ভাবে ‘ঘাট সুপারভাইজার’ পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়েই এমন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে চালকদের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রীদের যাতায়াতের চাপ বেড়ে যাওয়ায় পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় যানবাহনের চাপও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন রুট থেকে আসা বাস ও যাত্রীরা এই ঘাট ব্যবহার করে লঞ্চ ও ফেরিতে নদী পারাপার হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র নিজেদের ঘাটের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে চালক ও স্টাফদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক ও পরিবহন স্টাফ জানান, ‘ঢাকা থেকে যতবার আমরা যাত্রী নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে আসি, ততবারই ২৫০ টাকা করে দিতে হয়। তারা নিজেদের সুপারভাইজার পরিচয় দিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে টাকা নেয়। না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানির আশঙ্কা থাকে।’

স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

পাটুরিয়া ঘাটে দায়িত্বে থাকা জেলা পুলিশের টিআই (অ্যাডমিন) আব্দুল হামিদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের চাঁদাবাজির বিষয়ে তার কাছে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি এবং তিনি বিষয়টি অবগত নন। তবে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘাট এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। এমন কোনো ঘটনা নজরে এলে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’