জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত শাসনব্যবস্থায় সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে যেভাবে অবক্ষয় তৈরি করা হয়েছিল, তা সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। আমরা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক- সব দিক থেকেই তলানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর জাতি সেই গর্ত থেকে উঠে এলেও এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, সংকীর্ণতা ও প্রতিহিংসার কালোছায়া এখনো বিরাজ করছে।
আজ রবিবার (২২ মার্চ) সিলেট সার্কিট হাউজে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রাজনীতিবিদদের নৈতিক স্খলন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এক সময় রাজনীতিবিদ শুনলে মানুষ শ্রদ্ধায় মাথা নত করত। এখন রাজনীতিবিদরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের কারণে সেই জায়গা হারিয়ে ফেলছেন। অনেকে আসমানের ফেরেশতার মতো সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে কাজের সাথে তার কোনো মিল নেই। এই দ্বৈতনীতির কারণে মানুষের মনে রাজনীতি নিয়ে শ্রদ্ধার বদলে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।’
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যতক্ষণ কথা ও কাজের মিল রেখে জাতির আস্থা অর্জন করতে না পারবে, ততক্ষণ একটি আদর্শ জাতি গঠন সম্ভব নয়।
সমাজের ওয়াচডগ হিসেবে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, রাজনীতিবিদদের সোজা পথে রাখার মৌলিক দায়িত্ব সাংবাদিকদের। কিন্তু বর্তমানে সাংবাদিকতায় বিবেক ও সমাজের প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তিনি সাংবাদিকদের হারানো শক্তি ও সাহস ফিরিয়ে এনে সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
গত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কেন তারা সরাসরি রাজপথে প্রত্যাখ্যানের পুরনো ধারায় যাননি, তার ব্যাখ্যা দিয়ে আমিরে জামায়াত বলেন, ‘আমরা দেশে ইতিবাচক রাজনীতির নতুন ধারা প্রবর্তন করতে চাই। আমরা বুক চিপে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছি যাতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তবে টিআইবি এবং সুজন-এর রিপোর্ট প্রমাণ করেছে সেই নির্বাচন কেমন ছিল। আমরা চেয়েছিলাম একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ, যেখানে অধিকার কারো দয়া নয়, বরং পাওনা হিসেবে গণ্য হবে।’
ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন যে, দেশের যুবসমাজ প্রচলিত ধারার রাজনীতি আর দেখতে চায় না। তারা আমূল পরিবর্তন চায়। তিনি বলেন, গণভোটে ৬৮ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছে। আমরা বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংসদ সদস্য পদের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি দল সেই শপথ নেয়নি। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা যদি পূরণ না হয়, তবে সমাজ আগের বিশৃঙ্খল পথেই হাঁটবে।
তৎকালীন স্বৈরাচারকে সহযোগিতার অভিযোগে বর্তমান রাষ্ট্রপতির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা বিতর্কিত ব্যক্তির বক্তব্য সংসদে শুনতে চাইনি। তবে আমরা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে দেখি। রাষ্ট্রপতির পদের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে। আমরা সরকারি দলকে অনুরোধ করব, আপনাদের দলেই অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন। জাতির আকাঙ্ক্ষা বুঝে এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কমুক্ত করুন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি দেশপ্রেমকে কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানান। দেশের সম্পদ রক্ষা, আইন মেনে চলা এবং বৈষম্যহীন সোনার বাংলা' গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আসুন, বিভেদ ভুলে আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি যাতে প্রতিটি নাগরিক তার প্রকৃতিগত অধিকার ফিরে পায় এবং জাস্টিস সবার জন্য সমান হয়।