১২ ঘণ্টায় ৭ সড়ক দুর্ঘটনা, ঝরে গেল ২৩ প্রাণ

ঈদের দ্বিতীয় দিন ১২ ঘণ্টায় দেশের পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৪৫ জন। দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে কুমিল্লা, ফেনী, হবিগঞ্জ, পাবনা, কিশোরগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে। এ ছাড়া বান্দরবানে পর্যটকবাহী বাস খাদে পড়ে ১৭ জন আহত হয়েছেন।

কুমিল্লা

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে বাসে মেইল ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, তিনজন নারী ও দুজন শিশু রয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে যশোর জেলার পাঁচজন। তারা হলেন লাইজু আক্তার (২৬), তার দুই মেয়ে খাদিজা (৬) ও মরিয়ম (৩), চৌগাছার সিরাজুল ইসলাম (৭০) ও কোহিনূর বেগম (৫৫)। নোয়াখালীর দুজন নিহত হয়েছেন সোনাইমুড়ির বাবুল চৌধুরী (৫৫) এবং ফাজিলপুরের নজরুল ইসলাম রায়হান (৪৫)। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন চাঁদপুরের তাজুল ইসলাম (৬৭), ঝিনাইদহের জুহাদ বিশ্বাস (২৪), মাগুরার ফচিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার সোহেল রানা (২৫) এবং লক্ষ্মীপুরের সাঈদা (৯)।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। আহতদের মধ্যে ১৮ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন, আর পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অজয় ভৌমিক জানান, নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, রেলগেটের দায়িত্বে থাকা কর্মীর অবহেলার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আহত যাত্রীরা জানান, বাসটি চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুর যাচ্ছিল এবং ঢাকাগামী একটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।

ফেনী

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। এতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন।

রবিবার (২২ মার্চ) ভোর ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মরদেহ ফেনী সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা রয়েছে। হতাহতদের নাম-পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মহিপাল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুল ইসলাম জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি লেনে সেতুর সংস্কার কাজ চলছিল। একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীর গতিতে সেতুটির আগের স্পিডব্রেকার পার হচ্ছিল। এমন সময় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়।

এ ঘটনায় বাস ও অ্যাম্বুলেন্স চালকের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হলে পেছনে মোটরসাইকেল ও আরও কিছু বাসের জট লেগে যায়। কিছুক্ষণ পর বেপরোয়া গতিতে আসা দোয়েল পরিবহনের একটি বাস জটলার মধ্যে ধাক্কা দেয়। এতে একজন মোটরসাইকেল আরোহী, বাসের সুপারভাইজার ও একজন যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও পাঁচজন।

হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জের মাধবপুরে পিকআপ ভ্যান খাদে পড়ে নারীসহ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আন্দিউড়া এলাকায় রবিবার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা জানিয়েছেন।

নিহতরা হলেন পিকআপ ভ্যানের চালক ইব্রাহিম, আসমা আক্তার (৪০) ও তার ছেলে সজিব (১৩)।

মাধবপুর থানার ওসি শুভ রঞ্জন চাকমা জানান, ঘরের আসবাবপত্র বোঝাই একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই চার জনের মৃত্যু হয়।

পাবনা

আগামীকাল সোমবার (২৩ মার্চ) বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল জুলফিকার ইসলাম জিল্লুরের (২৬)। ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ, চলছিল শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কিন্তু এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই সব আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।

রবিবার (২২ মার্চ) সকালে নাটোর–পাবনা মহাসড়কের গড়মাটি কলোনি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত জুলফিকার ইসলাম জিল্লুর পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার নওদাপাড়া গ্রামের আনছারুল হক মুন্সীর ছেলে।

নাটোরের বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আগামীকাল ছিল জিল্লুরের বিয়ের দিন। বিয়ের দাওয়াত দিতে তিনি বড় ভাই রফিকুল ইসলামের প্রাইভেটকার নিজেই চালিয়ে গড়মাটিতে বোনের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পিকআপভ্যানের চাপায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও একজন। রবিবার (২২ মার্চ) বিকেলে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব মহাসড়কের কুলিয়ারচর উপজেলার দাড়িয়াকান্দি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হচ্ছেন দরিয়াকান্দি এলাকার বিজয় ও তার বন্ধু জাবির হোসেন।

হাইওয়ে পুলিশ জানায়, কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের দারিয়াকান্দি এলাকায় একই মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন তিন যুবক। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা মুরগিবোঝাই করা একটি পিকআপভ্যান মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বিজয় (১৮) ও জাবির (১৮)।

বান্দরবান

বান্দরবানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পর্যটকবাহী একটি বাস খাদে পড়ে অন্তত ৩০ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। রবিবার (২২ মার্চ) ভোরে ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা সৌদিয়া পরিবহনের একটি বাস সুয়ালক বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ৪০ জন যাত্রী নিয়ে সৌদিয়া পরিবহনের একটি বাস ঢাকা থেকে বান্দরবানে আসছিল। রবিবার ভোর ৫টায় বাসটি জেলা সদরের সুয়ালক বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ঢালে নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি খাদে পড়ে যায়। এতে বাসের ভেতরে থাকা অধিকাংশ যাত্রীরা গুরুতর আহত হয়।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. ধীমান দাশ বলেন, ভোরে পর্যটকবাহী একটি সৌদিয়া পরিবহনের বাস পাহাড়ি খাদে পড়ে গিয়ে বাসে থাকা অধিকাংশ যাত্রী আহত হয়। তার মধ্যে চার জনের অবস্থা গুরুতর। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে।

কুড়িগ্রাম 

কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাউদা খাতুন (১১) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা-মা গুরুতর আহত হয়েছেন।

রবিবার (২২ মার্চ) দুপুরে উপজেলার চর রাজিবপুর ইউনিয়নের বটতলা কারিগরপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার হারুয়া বাড়ি পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম (৪৫) তার স্ত্রী মোছা. ঝরণা বেগম (৩০) ও মেয়ে সাউদা খাতুনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে শ্বশুরবাড়ি রৌমারীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বটতলা কারিগরপাড়া এলাকায় একটি সিমেন্টবোঝাই ট্রাককে ওভারটেক করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি অটোরিকশার সঙ্গে মোটরসাইকেলটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তিন আরোহী সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।

চর রাজিবপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুসা মিয়া বলেন, দুর্ঘটনায় আহত শিশুটির মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।