পঞ্চগড় ইকো পার্ক

বাঁশ-বেতের কারুকাজ, ফোয়ারার ঝলকে উচ্ছ্বসিত দর্শনার্থীরা

ঈদের ছুটিতে যখন চারপাশে উৎসবের রঙ, তখন পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা জেলা প্রশাসন ইকো পার্ক হয়ে উঠেছে এক টুকরো চোখ জুড়ানো সবুজের স্বপ্ন। বাঁশ-বেতের কারুকাজ, বাহারি ফুলের সারি, ফোয়ারার ঝলক আর দেশি–বিদেশি গাছগাছালির সমারোহে সেজে উঠেছে এই পার্ক। ঈদের দিন আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অনেকে বাসাবাড়ি থেকে বের হতে পারেনি।

আজ রবিবার হাজারো মানুষের ভিড়। এমন অবস্থা চলবে আরো কয়েকদিন। কয়েকদিন ধরে এখানে উপচে পড়া ভিড় চলবে  দর্শনার্থীদের। জেলায় তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রায় ২৫ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করা হয়। পরে ৫ একর জমি নিয়ে এই ইকো পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় জেলা প্রশাসন। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে রয়েছে ২০ হাজারের বেশি ফুল ও ফলের গাছ, কৃত্রিম লেক, পানির ফোয়ারা, হাঁটার পথ ও বসার জায়গা, মিনি অডিটোরিয়াম।

ইকোপার্ক সূত্রে জানা যায়, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার দর্শনার্থী ৩০ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন পার্কে। শিশুদের জন্য রয়েছে খেলাধুলার সুযোগ, আর প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক এক মুক্ত আঙিনা, আড্ডা, ছবি তোলা আর সময় কাটানোর জন্য আদর্শ জায়গা। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকছে পার্কটি। পার্কের দর্শনার্থীদের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। রয়েছে নামাজ ও গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।ঈদের দিন পার্কে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে প্রশংসায় ভাসালেও, কিছু যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সুলতানা বেগম বলেন, আমাদের জেলায় তেমন পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র নেই। এটি হওয়াতে আমাদের অনেক ভালো হয়েছে। ঈদে ও ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসি অনেক ভালোই লাগছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী সেলিনা আকতার বলেন, পার্কটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। হাঁটার পথ সব কিছুই ভালো লেগেছে। তবে এখানে যদি বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকত, তাহলে ঘোরাটা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের হতো। তবে সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা ছিল।

পরিবার নিয়ে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মারুফ হাসান জানান, পঞ্চগড়ে এমন সুন্দর একটি জায়গা গড়ে তোলায় আমরা সত্যিই খুশি। তবে যেহেতু নতুন তুলনামূলকভাবে রাইড ও দেখার মতো স্থাপনা কম তাই পার্কে ঢোকার টিকিটের মূল্য কিছুটা কম হলে সাধারণ মানুষ আরও স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারত।

পরিবার নিয়ে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুল মোমিন জানান, পঞ্চগড়ে এমন সুন্দর একটি জায়গা গড়ে তোলায় আমরা সত্যিই খুশি। তবে যেহেতু নতুন তুলনামূলকভাবে রাইড ও দেখার মতো স্থাপনা কম, তাই পার্কে ঢোকার টিকিটের মূল্য কিছুটা কম হলে সাধারণ মানুষ আরও স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারত।

ছাত্র ও ফটোগ্রাফার ইফতেখার রহমান জানান, আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। পার্কটিতে আরও কিছু রাইড, শিশুদের জন্য বাড়তি বিনোদন ব্যবস্থা যুক্ত হলে এটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

পঞ্চগড়ের পর্যটন নিয়ে কাজ করানর্থবাংলা ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের নির্বাহী পরিচালক মোবারক হোসাইন বলেন, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন ইকো পার্ক দিন দিন দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি জেলার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ শুধু বিনোদন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও এনেছে গতি। পার্কের আশপাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের ভিড়। অনেকেই বলছেন, এই পার্ক ঘিরেই তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা।

ইকো পার্কের ম্যানেজার নয়ন তানবিরুল বারি বলেন, দর্শনার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতে আমরা পার্কে নতুন রাইড ও অবকাঠামো সংযোজনের পরিকল্পনায় রয়েছে। নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসন নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।

পার্কে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন পার্কের প্রতিষ্ঠা সাবেক জেলা প্রশাসক সাবেত আলী বলেন, এই জমিটি একসময় পতিত অবস্থায় ছিল। এটি জেলার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, পার্কটিকে দেশের অন্যতম মানসম্পন্ন ইকো পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা। সেজন্য পর্যায়ক্রমে আরও সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও স্থাপনা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান জেলা প্রশাসন এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছেন।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুমন চন্দ্র দাশ জানান, ঈদ উপলক্ষে শুধু ইকো পার্ক নয়, জমজমাট জেলার অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোও। দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে তেঁতুলিয়ার জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, মহানন্দা নদীর পাড়, সমতলের চা বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, অমরখানা মুক্তাঞ্চল পার্ক, দেবীগঞ্জ ডিসি পার্ক, ময়নার চর, মহারাজার দিঘী, মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়। আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিয়েছি এসব এলাকায়।

সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা জেলা প্রশাসন ইকো পার্কই এই ঈদের সবচেয়ে আলোচিত এবং জনসমাগমে ভরপুর স্থান। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়োপযোগী সম্প্রসারণ চালিয়ে গেলে, এই পার্কটি অচিরেই দেশের অন্যতম পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।