মানুষের চরিত্রকে মহিমান্বিত করে যে গুণগুলো, তার মধ্যে বিনয় অন্যতম। জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি মানুষকে বড় করে না, বরং তাকে সত্যিকার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে নম্রতা ও বিনয়। কারণ বিনয় মানুষকে অহংকারের অন্ধকার থেকে দূরে রাখে এবং তার অন্তরে জাগিয়ে তোলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি। যে ব্যক্তি নিজের অর্জনকে নিজের কৃতিত্ব মনে না করে আল্লাহর দান বলে উপলব্ধি করে, তার হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিনয়ের সৌন্দর্য বিকশিত হয়। বিনয় মানুষের সামাজিক সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলে। বিনয়ী মানুষ সহজেই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। তার আচরণে থাকে কোমলতা, কথায় থাকে মাধুর্য, আর ব্যবহারে প্রকাশ পায় সৌজন্য ও সহমর্মিতা। ফলে মানুষ তার সান্নিধ্যে স্বস্তি অনুভব করে এবং তাকে সম্মান ও ভালোবাসায় ঘিরে রাখে। অন্যদিকে অহংকার মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বিনয়ীরা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। গর্বভরে চলে না এবং অহংকারীর মতো পা ফেলে না। অহংকারের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে পথ চলে না। গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো চলে নিজের শক্তি প্রকাশের চেষ্টা করে না। বরং তাদের চালচলন হয় একজন ভদ্র, মার্জিত ও সৎস্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তির মতো।
হজরত ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহতায়ালা তার মর্যাদা উঁচু করেন। ফলে সে নিজের চোখে ও নিজের ধারণায় ছোট হয়। কিন্তু মানুষের দৃষ্টিতে সে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। আর যে অহংকার করে, আল্লাহতায়ালা তার মর্যাদা নিচু করে দেন। ফলে সে মানুষের চোখে ছোট হয়ে যায়, যদিও সে নিজের ধারণায় বড় হয়। এমনকি সে মানুষের দৃষ্টিতে কুকুর ও শূকরের চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে যায়।’ (শোয়াবুল ইমান ৭৭৯০)
হাদিসের মধ্যে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, ‘তাওয়াজায়া লিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর জন্য বিনয়। এই মহৎ গুণটি একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেক বিনয়ী মানুষ পাওয়া যায়, কিন্তু উদ্দেশ্য আল্লাহর জন্য নয়, বরং অন্য কোনো দুনিয়ার হীন স্বার্থ। এর দ্বারা কখনো সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারবে না। বরং এটি অহংকারের ভিন্ন রূপ।
আমাদের সমাজে বাহ্যত বেশভূষায় বিনয়ী মানুষে ভরে গেছে। এর দ্বারা নতুন নতুন ফেতনা সৃষ্টি হয়। বিনয়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। নামের শুরুতে অধম লেখলেই বিনয়ী হওয়া যায় না, বরং তা অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিনয়ী ব্যক্তিদের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং বিনীত হয়েছে তাদের রবের প্রতি, তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।’ (সুরা হুদ ২৩)
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমি কি তোমাদের জানাব না যে, কারা জাহান্নামের জন্য হারাম বা কার জন্য জাহান্নাম হারাম করা হয়েছে? জাহান্নাম হারাম আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী প্রত্যেক বিনয়ী ও নম্র লোকের জন্য।’ (সুনানে তিরমিজি ২৪৮৮)
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক