সমাজে ভারসাম্য আনে সহনশীলতা

ব্যস্ততা ও অস্থিরতার এই যুগে মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি যে গুণটির অভাব পরিলক্ষিত হয়, তা হলো সহনশীলতা। এটি আদর্শ সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সহনশীলতা মানুষকে কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রশান্তি দেয় না, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার এক মজবুত সেতুবন্ধন তৈরি করে। যখন রাগ ও প্রতিহিংসার বদলে ক্ষমা এবং ধৈর্য প্রাধান্য পায়, তখনই একটি জনপদ বিবাদমুক্ত ও সুন্দর হয়ে ওঠে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, প্রকৃত শক্তি পেশির জোর বা তর্কে জেতার মাঝে নয়, বরং কঠিন মুহূর্তে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার মাঝে নিহিত।

সহনশীল হওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষটি দুর্বল, বরং এটি তার আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা ও উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। আমাদের প্রতিদিনের ছোটখাটো মতভেদ যখন ধৈর্যের মাধ্যমে নিরসন হয়, তখন তা বৃহত্তর সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহর ভালোবাসা এবং প্রিয় নবীজি (সা.)-এর আদর্শকে ধারণ করে জীবনকে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে সহনশীলতার কোনো বিকল্প নেই।

কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আর যারা ক্রোধকে সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪) এই আয়াত মানুষের অন্তরে এক অসাধারণ বার্তা জাগায়, অন্য কেউ যদি কষ্ট দেয়, তবুও ধৈর্য ধরে তাকে ক্ষমা করা হলো এমন একটি কাজ, যা আল্লাহর প্রিয় বান্দার পরিচয় বহন করে। সহনশীলতার মাধ্যমে শুধু যে পরকালীন পুরস্কার অর্জন হয় তা নয়, বরং দুনিয়ার জীবনও প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তায়েফে যখন তাকে পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করা হলো, তখন পাহাড়ের ফেরেশতা এসে প্রস্তাব করলেন, আপনি ইচ্ছা করলে তায়েফের মানুষদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু নবীজি (সা.) বললেন, ‘আমি আশা করি, তাদের সন্তানদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে যারা আল্লাহর একত্ববাদ গ্রহণ করবে।’ (সহিহ বুখারি) এই হলো সহনশীলতার প্রকৃত চিত্র। নিজের কষ্ট মেনে নিয়েও তিনি অন্যের হেদায়াতের আশা করেছিলেন।

সহনশীলতা আমাদের সামাজিক জীবনে ভারসাম্য সৃষ্টি করে। যে সমাজে সবাই একটু একটু সহনশীলতা প্রদর্শন করে, সেখানে অস্থিরতা কমে যায়, ভালোবাসা বাড়ে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো মানুষের অস্থিরতা।

ছোট্ট কোনো কারণে বড় ঝগড়া হয়ে যায়। রাস্তায় যানজট হলে ধৈর্যহারা হয়ে মানুষ চেঁচিয়ে ওঠে। বাজারে কেনাবেচার সামান্য ব্যাপার নিয়েও ঝগড়া বাঁধে। সামাজিক মাধ্যমে মতভেদ হলেই পরস্পরের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়। এই অস্থির মানসিকতা আমাদের সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করছে। অথচ ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় ধৈর্যধারণ করতে, সহনশীল হতে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ধরো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩) ধৈর্যশীল মানে সেই মানুষ, যে নিজের কষ্টকে সহ্য করতে জানে, অন্যের কটু কথা বা কষ্ট দেওয়াকে ক্ষমা করতে জানে। আমাদের সমাজ যদি এই শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তবে দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনেকটাই কমে যাবে।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার