আলু এখন কৃষকের গলার কাঁটা

দাম পাচ্ছেন না আলু উৎপাদনকারী কৃষক। দামে ধস নামায় উৎপাদিত আলু এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এক কেজি আলু উৎপাদনে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা খরচের বিপরীতে কৃষক বিক্রি করছেন ৪ থেকে ৮ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৮ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ কম।

এতে করে কৃষকের ঘাড়ে ঋণের চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কারণ পরপর দুই বছর ধরে একইভাবে লোকসান গোনার কারণে আলুর চাষ কমে যাচ্ছে। এতে পরবর্তী বছরগুলোতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ এক মৌসুমে উৎপাদিত এই আলু সারা বছরের দেশের মানুষের খাবার টেবিলের জোগান নিশ্চিত করে।

অথচ সরকার আলুচাষিদের নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভাবছে না। ঠিকঠাক নীতি গ্রহণে সরকারের অনীহা, প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করা কৃষককে আলু চাষে ব্যাপকভাবে নিরুৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ আলুর দামের এ বিপর্যয় শুরু হয়েছে গত বছর থেকেই।

মুন্সীগঞ্জ জেলায় এখন আলু তোলার ধুম পড়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলা জুড়ে এ মাসের প্রথমভাগে আলু তোলা শুরু হয়েছে। তবে দাম কম থাকায় কৃষকের মুখে নেই হাসি। গেল বারের লোকসানের পর এবার আরেক দফায় লোকসানে পড়ে ভালো ফলনও কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। কারণ দাম কম থাকার পরও জমিতে মিলছে না পাইকারের দেখা। সব মিলে লাভের আশা গুড়েবালি। দেশ রূপান্তরের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ খোকা জানান, ১৫ টাকার বেশি উৎপাদন খরচ হলেও পাইকার প্রতি কেজি আলু কিনছেন মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকায়। এতে অনেক কৃষক জমিতেই আলু স্তূপাকারে রেখে দিয়েছেন।

সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমশুরা গ্রামের মো. নুরনবী মুন্না এ বছর ২৪০ শতাংশ জমিতে আলু আবাদ করেছেন। তিনি জানান, আলু আবাদে তার খরচ পড়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কেজি প্রতি আলু উৎপাদনে তার খরচ হয় ১৫ টাকা।

এই কৃষক বলেন, জমিতে পাইকারদের কাছে ৩০০ টাকা দরে এক মণ আলু বিক্রি করেছি। সেই হিসাবে প্রতি কেজি আলুতে দাম পড়েছে মাত্র সাড়ে ৭ টাকা। অর্থাৎ খরচের অর্ধেকও উঠে আসেনি। শুধু তাই নয়, দাম কম থাকার পরও জমিতে পাইকার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কম দামেও আলু বিক্রি করা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

দেশের যে কয়েকটি অঞ্চলে আলুর চাষ বেশি হয় তার মধ্যে রংপুর অন্যতম। মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যায় এ বিভাগ থেকে। দেশ রূপান্তরের রংপুর প্রতিনিধি তাজিদুল ইসলাম লাল সরাসরি কথা বলেছেন আলুচাষিদের সঙ্গে। পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর এলাকার কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, মৌসুমে এক একর জমি ইজারা নিতে হয়েছে ৩২ হাজার টাকায়। জমি চাষের খরচ প্রায় ৮ হাজার, ভিটামিনসহ অন্যান্য ৬ হাজার, বীজ বাবদ ৫০ হাজার, রোপণের সময় শ্রমিক ব্যয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা, রাসায়নিক সার ১৩ হাজার ৫০০, আলু বাঁধা ৮ হাজার ৫০০, সেচ বাবদ ৪০০, ওষুধ স্প্রে শ্রমিকসহ ১৬ হাজার এবং আলু উত্তোলন বাবদ ৯ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়েছে। এক একর জমিতে আলু চাষ বাবদ মোট ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ টাকা। এতে আলুর উৎপাদন হয়েছে ৮ হাজার ৯০০ কেজি। ফলে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৬০ পয়সায়।

অথচ এই কৃষককে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ উৎপাদিত আলুতে কৃষকের অর্ধেক টাকাই গচ্চা। একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন রংপুর সদর উপজেলার বুড়িহাট বাহাদুর সিংহ এলাকার কৃষক আব্দুল হান্নান, গঙ্গাচড়া উপজেলার আলুচাষি আতাউর রহমানসহ আরও অনেকেই। এদের অনেকেই এখন ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে চিন্তিত। এবার দাম না পেয়ে অনেক কৃষকই হিমাগারে আলু রাখছেন না। বাড়িতেই কেউ কেউ স্তূপ করে রেখে দিয়েছেন।

রংপুরের কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছর দাম না পাওয়ার কারণে এখানে আলুর আবাদ এবার কম হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় এবার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন। এর মধ্যে রংপুর জেলায় আলু চাষ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টরে, যা গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। অর্থাৎ এবার রংপুর জেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়নি।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, চাহিদার তুলনায় আলু উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে দাম বাড়ছে না। আলু রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা চলছে। ঈদের পর আলু রপ্তানি শুরু হলে দাম বাড়বে।

রংপুরের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন জয়পুরহাটে। এ জেলার আলুচাষিরা আরও কম দামে আলু বিক্রি করছেন। প্রতি কেজি আলু ৪ থেকে ৮ টাকার মধ্যে বিক্রি করছেন। জয়পুরহাট প্রতিনিধি রেজাউল করিম রেজা জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানান, গত বছর ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। গত বছর দাম না পাওয়ার প্রভাবে এখানেও আবাদ কমেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও সাম্প্রতিক বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টিতে আলুচাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে জয়পুরহাটের কৃষকদের।

কথা রাখেনি সরকার : গত বছর আলু দামে ধস নামায় কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় আলুচাষিদের জন্য নিয়মিত বরাদ্দের পাশাপাশি ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কৃষক এই ভর্তুকির সুবিধা পায়নি। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে। তবে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি।

একই সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল ৫০ হাজার টন আলু কিনবে, যা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা ছিল। পরে এই আলু আর কেনা হয়নি। যে কারণে নতুন আলু উঠলেও এখনো কোল্ড স্টোরেজগুলোতে গত বছরের পুরনো আলুও রয়ে গেছে।

এদিকে গত ১৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে কৃষকদের এ অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে বৃষ্টিতে যেসব অঞ্চলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আলু কিনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করার একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত ১৭ মার্চ এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সব সমস্যা নিয়ে এদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে কৃষকের আলুর দাম না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতি সময়ে হওয়া বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের আলু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ত্রাণে কীভাবে ব্যবহার করা যায় সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করছি কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে। কার্ড বাস্তবায়ন হয়ে গেলে, যেকোনো ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কৃষকের হাতে প্রণোদনা দ্রুত পৌঁছে দিতে পারব। শুধু তাই নয়, কৃষকের যাবতীয় সহযোগিতা ও প্রয়োজন মিটবে এই কার্ড দিয়ে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯১২ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি ছিল। সে সময় আলু উৎপাদন হয় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ টন। এর মধ্যে দেশে খাবার আলুর চাহিদা রয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন। রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকাসহ অতিরিক্ত উৎপাদিত আলুর ব্যবস্থাপনা ঘাটতি থাকায় আলুর দাম পাননি কৃষক। এ বছর আলুর ফলন ভালো হলেও রংপুর অঞ্চলের সাম্প্রতিক বৃষ্টি কিছু আলুর ক্ষতি করেছে, যা মোট উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।

জানতে চাইলে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলু উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। তা না হলে কৃষক আলুতে লাভ করতে পারবেন না। এ ছাড়া উৎপাদন ধরে রাখতে সরকারকে আলুচাষিদের ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।’

কৃষি অর্থনতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সরকারকে নীতি সহায়তা দিতে হবে। সেটা প্রযুক্তিগত হতে পারে, ভর্তুকিও হতে পারে। কৃষক এভাবে ধারাবাহিক লোকসানে পড়লে আলু উৎপাদন কমবে, দামে অস্থিরতা তৈরি হবে, যা আসলে খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে।