গ্রীষ্মের আগমুহূর্তেও কুয়াশা!

শীত শেষ হয়েছে জানুয়ারিতে, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে কিছুটা শীত শীত ভাব থাকলেও পরে তা কেটে গিয়ে বসন্তকালও শেষ হতে চলেছে। চারদিকে কালবৈশাখীর ঝড় বইছে। বাতাসের তাপমাত্রার পারদ বেশি থাকায় গ্রীষ্মের দাপটের আভাস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে আবার কুয়াশা কেন? ভোররাতের পর থেকে শুরু হওয়া কুয়াশা থাকে সকালের সূর্য ওঠা পর্যন্ত। অনেকে এ কুয়াশাকে প্রকৃতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন।

আসলে কি জলবায়ু পরিবর্তন, না অন্য কোনো কারণে প্রকৃতিতে এ কুয়াশা দেখা যাচ্ছে? তবে চট্টগ্রামসহ দেশের পুরো উপকূলীয় এলাকায় এ কুয়াশা বেশি দেখা যাচ্ছে। গতকাল শুক্রবার দেশের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই ম্যারাথনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৫০০-এর বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল। ম্যারাথনে অংশ নেওয়াদের একজন ছিলেন সমাজ উন্নয়নমূলক সংগঠন ইপসার প্রধান নির্বাহী ড. মো. আরিফুর রহমান। পরিবেশ, দুর্যোগ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, শুক্রবার ভোরে ম্যারাথন শুরু হওয়ার আগে খুব ঘন কুয়াশা দেখা দিয়েছে। শুধু ঘন কুয়াশাই নয়, সঙ্গে প্রচন্ড গরমও অনুভূত হয়েছে, সবাই গরমে ঘামছিলেন। তবে সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পর কুয়াশা কেটে যায়।

কুয়াশার এ ঘটনা শুধু কুতুবদিয়ায় নয়, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এবং শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও দেখা গেছে ভোরে। শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল নয়, সারা দেশের উপকূলীয় এলাকায় দেখা দেওয়া এ কুয়াশা আরও সপ্তাহখানেক থাকবে বলে আবহাওয়াবিদরা জানান। এ বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা তরিফুল নেওয়াজ কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন সাগর থেকে জলীয় বাষ্প আসছে। সেই জলীয় বাষ্পের কারণে উপকূলীয় এলাকার বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায় আর আর্দ্রতা বেড়ে গিয়ে ভ্যাপসা গরম বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে কুয়াশাও তৈরি করে। সূর্য ওঠার পর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কুয়াশা কেটে যায়।’

তাহলে কি আর্দ্রতার কারণে কুয়াশা?

দেশের আবহাওয়ার ৪৪ বছরের উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, ‘সাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে বাতাস স্থলভাগের দিকে আসে। কালবৈশাখীর সময় শুরুর পর থেকে গ্রীষ্মের আগপর্যন্ত এ সময়ে উপকূলের দিকে আসা এসব জলীয়বাষ্প আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ঘনীভূত হয়ে কুয়াশায় পরিণত হয়। আর এ কারণেই উপকূলীয় এলাকায় কুয়াশা দেখা যায়।’

ড. বজলুর রশিদের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, কুয়াশা হওয়ার জন্য বাতাসের আর্দ্রতা ৯৩ শতাংশের বেশি হতে হবে। আর উপকূলীয় এলাকায় বছরের এ সময়ে সকালের দিকে আর্দ্রতা ৯৩ শতাংশের বেশি হয়ে থাকে। এ কারণেই কুয়াশা হচ্ছে। তবে তা অল্প সময়ের জন্য। সূর্য ওঠার পর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্দ্রতা কমতে থাকে।

উপকূলীয় এলাকাগুলোর গতকাল ভোর ৬টায় বাতাসে আর্দ্রতা কত ছিল জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, চট্টগ্রামে ছিল ৯৪ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৯৭ শতাংশ, বরিশালে ১০০ শতাংশ, ভোলায় ও খেপুপাড়ায় ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ, সব উপকূলীয় এলাকাতেই আর্দ্রতা ৯৩ শতাংশের বেশি ছিল।

আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের এ সময়টিতে উপকূলীয় এলাকায় ভূপৃষ্ঠের নিচের অংশে তাপমাত্রা কমে যায় এবং ওপরের অংশে আবার তাপমাত্রা বেশি থাকে। উভয় স্তরের বৈপরীত্যের কারণে একটি কুয়াশা বলয় তৈরি হয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বলয় কেটে যায় এবং আর্দ্রতা কমতে থাকে। এজন্যই ভ্যাপসা গরম সকালের পর ধীরে ধীরে কমে আসে।

কতদিন হবে এমন কুয়াশা?

আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় ভোরের দিকে এমন কুয়াশা থাকতে পারে। তবে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে আর কুয়াশা দেখা যাবে না। একই মন্তব্য করেন আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক। তিনি বলেন, এপ্রিলের ৩ বা ৪ তারিখ পর্যন্ত হয়তো এমন আবহাওয়া উপকূলীয় এলাকায় থাকতে পারে।

বর্তমানে সারা দেশে কালবৈশাখী শুরু হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝড়ও বইছে। এ ছাড়া এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে গ্রীষ্মকাল। স্বাভাবিকভাবেই দেশে গরমের তীব্রতা বাড়বে।