যক্ষ্মা নির্মূল এখনো অনেক দূরে

দেশে যক্ষ্মা (টিবি) নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি থাকলেও রোগটি এখনো পুরোপুরি নির্মূল করা যাযনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮১ জনে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় গত ২৪ মার্চ পালিত হয়েছে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘হ্যাঁ! আমরা যক্ষ্মা নির্মূল করতে পারি’। দিবস পালনে আশাবাদী বার্তা দিলেও বাস্তবতা বলছে, পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হলেও এখনো অনেক রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করছে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত শনাক্তের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। তবুও সচেতনতার অভাব, চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া এবং দেরিতে হাসপাতালে আসার প্রবণতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা শনাক্তের দিক থেকে বাড়ছে। এর অর্থ এই নয় যে রোগ হঠাৎ বেড়ে গেছে, বরং মানুষ কিছুটা সচেতন হওয়ায় বেশি পরীক্ষা করাচ্ছেন। তারপরও অনেক রোগী এখনো শনাক্তের বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই অবহেলা করেন, পরীক্ষা করাতে দেরি করেন।’

তিনি জানান, একজন ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগী অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় অন্তত ১০ জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। তাই দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, ওজন কমে যাওয়া বা রুচি হ্রাস পাওয়া, এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যক্ষ্মা একটি প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগ। সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হলেও রোগীরা নিয়ম মেনে চিকিৎসা সম্পন্ন না করায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘যক্ষ্মার চিকিৎসা অন্তত ৬ মাস চালিয়ে যেতে হয়। কারও ক্ষেত্রে ৯ মাস থেকে এক বছর পর্যন্তও লাগতে পারে। কিন্তু অনেক রোগী এক মাস ওষুধ খেয়ে একটু ভালো বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এখানেই বড় সমস্যা।’

এই অনিয়মিত চিকিৎসার ফলেই তৈরি হচ্ছে মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) যক্ষ্মা, যা চিকিৎসা করা আরও কঠিন। ডা. আয়শা জানান, ‘যখন রোগী নিয়ম মেনে ওষুধ খান না, তখন জীবাণু ওষুধের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। তখন সাধারণ ওষুধ কাজ করে না। এমডিআর হলে ১১ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত ভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাতেও রোগী ঝুঁকিতে পড়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি এমডিআর রোগী রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এই সংখ্যা কমাতে হলে রোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং ফলোআপ নিশ্চিত করতে হবে।

যক্ষ্মা শনাক্তে প্রযুক্তিগত উন্নয়নও এসেছে। আগে যেখানে রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগত, এখন জিন এক্সপার্ট মেশিনের মাধ্যমে মাত্র দেড় ঘণ্টায় রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। এতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়। তবে এই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই পরীক্ষা করাতে আসেন না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক অবহেলা। অনেকেই রোগের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন না। ফলে দেরিতে শনাক্ত হয় এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৪৪ জন নতুন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়। ২০২২ সালে এই সংখ্যা কমে ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৫৭-এ দাঁড়ায়। তবে ২০২৩ সালে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লাখ ১ হাজার ৫৬৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ জন রোগী শনাক্ত হয়। শনাক্ত রোগীর মধ্যে ৯৬ শতাংশ সুস্থ হয়েছেন। যক্ষ্মার প্রতি লাখে আক্রান্তের হারও উচ্চ থেকে স্থিতিশীল। ২০২১ সালে প্রতি লাখে ১৮০ জন আক্রান্ত ছিলেন, যা ২০২২ সালে সামান্য কমে ১৭৫ জনে আসে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আবার বেড়ে ১৮০ ও ১৮১ জনে পৌঁছায়। বাংলাদেশের প্রতি লাখে আক্রান্তের হার এখনো উচ্চ, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি লাখে আক্রান্তের হার কমছে না, ফলে ২০৩৫ সালের এসডিজি লক্ষ্য অনুযায়ী যক্ষা নির্মূল করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ লাখ পুরুষ, ৩৭ লাখ নারী এবং ১২ লাখ শিশু রয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যক্ষ্মা নির্মূলে কেবল চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং রোগীর চিকিৎসা সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর পুরো সময় ওষুধ সেবন নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণ ও জটিলতা বাড়তেই থাকবে।

তাদের মতে, যক্ষ্মা থেকে বাঁচতে হলে নিয়ম মেনে চিকিৎসা নিতে হবে, ডাক্তারের পরামর্শ মানতে হবে এবং ফলোআপে থাকতে হবে। একটু ভালো লাগলেই ওষুধ বন্ধ করলে বিপদ বাড়বে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যক্ষ্মা কমছে ঠিকই, তবে এই হারে কমলে নির্ধারিত সময়ে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। এই হারে কমলে আমরা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব না। আরও দ্রুত হারে কমাতে হবে।’ যক্ষ্মা দ্রুত কমাতে হলে কেবল রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। অপুষ্টি, ডায়রিয়া এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি বলেন, ‘যাদের শরীর দুর্বল, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, তারা যক্ষ্মায় বেশি আক্রান্ত হয়। সুস্থ মানুষের শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকলেও রোগে পরিণত হয় না, কিন্তু দুর্বল শরীরে তা দ্রুত সক্রিয় হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা গেলে যক্ষ্মাসহ অনেক সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইমারি হেলথকেয়ার শক্তিশালী হলে যক্ষ্মা, ডায়রিয়াসহ নানা রোগ কমে আসবে।’ এ ছাড়া দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে হবে।