যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় গভীর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এই প্রাণঘাতী সংঘাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভয়ংকর অর্থনৈতিক চাপে পড়বে
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে দক্ষিণ এশিয়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব অঞ্চলে দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই বাণিজ্য বা আন্তঃবাণিজ্যের হার খুবই হতাশাব্যঞ্জক। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত গত এক বছর ধরে ট্রাম্পের শুল্কারোপ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিঘ্নতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার পরীক্ষা নেবে। এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পরই বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনীতে ইতিমধ্যে চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের বন্দরে আটকে থাকা, চাল রপ্তানি থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সারের দামের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। অর্থনৈতিক শেষ তীব্রতা নির্ভর করবে, মূলত যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তার ওপর। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করার আগে, আইএমএফ আশা প্রকাশ করেছিল চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা বেশ ইতিবাচক। যুদ্ধ শুরুর পর আইএমএফ এখনো তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা চালাচ্ছে। বর্তমানে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এই প্রাণঘাতী সংঘাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভয়ংকর অর্থনৈতিক চাপে পড়বে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভিন্ন সামরিক তৎপরতার মাধ্যমে এই উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। গত এক দশকে এই দ্বন্দ্ব বহুবার সংঘাতের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কিন্তু কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পরিস্থিতিকে সাময়িক নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। যদি সংঘাতের কারণে এই পথ পুরোপুরি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পাবে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং খাদ্য সরবরাহসহ প্রায় সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। ফলে বিশ্ব জুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খাত ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়বে এবং আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা দিতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে, যা শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতকে প্রভাবিত করবে। পরিবহন ব্যয় নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে, যে কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে। এ ছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। কারণ জ্বালানি আমদানির জন্য বেশি ডলার ব্যয় করতে হবে। তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। যদি যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হয়, তাহলে কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তখন সংঘাতের প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনীতি ভারতও ব্যাপকভাবে জ¦ালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়লে, ভারতের শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। একইভাবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে, দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর ওপরও প্রভাব পড়বে। পোশাকশিল্প, প্রযুক্তি খাত এবং অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে আন্তর্জাতিক চাহিদা কমে গেলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। সংঘাতের কারণে অনেক দেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে আকাশপথ পরিবর্তন বা সাময়িকভাবে ফ্লাইট বাতিল করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যাহত হবে এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ থেকেও অনেক ফ্লাইট এর মধ্যে বাতিল হয়েছে এবং আরও বাতিল হতে পারে। তখন সেটি প্রবাসী যাত্রী, ব্যবসা এবং পর্যটনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে। তখন বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হবে। যুদ্ধের প্রধান ঝুঁকির বিষয়টি হলো, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকা নিয়ে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রচুর তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে এই রুটেই পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে ওমান বেষ্টিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের জন্য দৈনিক উৎপাদিত তেল ও তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি কার্যত চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য আকাশচুম্বী হবে। যদি এ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকে, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি হবে দ্বিগুণেরও বেশি। আর এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অবস্থা হবে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com