সাক্ষী যেন ‘সোনার হরিণ’

ইংল্যান্ডের বিখ্যাত আইন দার্শনিক প্রয়াত জেরেমি বেন্থাম ফৌজদারি মামলার সাক্ষীদের বলতেন বিচারের ‘চোখ’ ও ‘কান’। আদালতের বিচারক যেহেতু ঘটনার সময় উপস্থিত থাকেন না, তাকে নির্ভর করতে হয় সাক্ষীর ঘটনা দেখা, শোনার বিবরণ ও দালিলিক প্রমাণের ওপর। কিন্তু ফৌজদারি বিচারে এমন অনেক মামলা থাকে যাতে সাক্ষীর উপস্থিতি ‘সোনার হরিণের’ মতোই দুর্লভ। আইনজীবীদের ভাষায় তারা ‘হারিয়ে যায়।’ ফলে সাক্ষীর গড়হাজিরায় বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। সাক্ষীর স্মৃতিভ্রষ্টতাও তৈরি হয়। তাতে মামলার পরিণতি নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয় বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে।

২০০০ সালের ৯ এপ্রিল রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব উলন রোডে হায়দার আলী নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৮ অক্টোবর তিনজনকে অভিযুক্ত এবং ১৩ জনকে সাক্ষী করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০০২ সালে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়। এ হত্যা মামলাটির বিচার চলছে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ঘটনার প্রায় ২৬ বছর এবং বিচার শুরুর আদেশের ২৪ বছর পর ১৩ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্য হয়েছে। সবশেষ সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে আট বছরের বেশি সময় আগে ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট তারিখে। আসামিদের একজন মাসুদ পলাতক। ইয়াসিন খান ওরফে কালা পলাশ ও আহসান হাবিব ওরফে রিপন এখনো হাজিরা দিচ্ছেন। মামলার বাদী ভুক্তভোগীর মামা নুরে আলম সিদ্দিকী এখন আর আদালতে আসেন না।  

২০০৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজধানী তেজগাঁওয়ের রেলক্রসিং এলাকায় ১৫ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হন দুই নারী। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ২০০৫ সালের ৩ জুন অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ হয়। মামলাটি বদলিমূলে এখন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন। মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ২১ বছর আগের পুরনো এ মামলায় ১০ জন সাক্ষীর মধ্যে কেবল দুজন (তদন্ত কর্মকর্তাসহ) সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সবশেষ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে ২০০৯ সালের ১৮ অক্টোবর। অর্থাৎ ১৬ বছর ধরেই সাক্ষ্যবিহীন চলছে মামলাটি। জামিনে থাকা দুই আসামি বড় নাসিমা ও ছোট নাসিমা বছরের পর বছর হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী (গত ডিসেম্বর পর্যন্ত) দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে অনিষ্পন্ন ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪ মামলার মধ্যে ফৌজদারি মামলা রয়েছে ২৩ লাখ ৭২ হাজার। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন ১১টি গুরুতর ফৌজদারি মামলার নথি পর্যালোচনা এবং মামলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে দেশ রূপান্তর। নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সাক্ষীর গড়হাজিরা কিংবা অনিয়মিত সাক্ষ্যের কারণে কমপক্ষে ১৪ বছর থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত মামলাগুলোর বিচার অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।

এর মধ্যে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন ১৯৯৬ ও ২০০৩ সালের দুটি হত্যা মামলা, ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ বিচারাধীন ১৯৯৭ সালের ১টি হত্যা মামলা, প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন ২০০০ সালের একটি হত্যা মামলা, নবম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে বিচারাধীন ২০১৩ সালের ১টি হত্যা মামলা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এ বিচারাধীন ২০১৩ সালের ১টি হত্যা মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এ বিচারাধীন ছিল (এখন শিশু ধর্ষণ ট্রাইব্যুনালে বদলি) ১টি ধর্ষণের মামলা, প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে বিচারাধীন ২০০৯ সালের বিস্ফোরক আইনের ১টি মামলা, ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০ এ বিচারাধীন ২০০৩ ও ২০০৯ সালে মাদক আইনে দুটি মামলা এবং ঢাকার শিশু আদালত-২ এ বিচারাধীন ২০১২ সালে হওয়া একটি হত্যা মামলা রয়েছে। সারা দেশের আদালতগুলোতে এমন অসংখ্য অনিষ্পন্ন মামলা পড়ে আছে বছরের পর বছর। 

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনের পর দিন সমন পাঠালেও সাক্ষী আসে না। তাদের নির্ধারিত ঠিকানায় খোঁজ পাওয়া যায় না। সাক্ষী যেন সোনার হরিণের মতোই। অনেক মামলাতেই সাক্ষীর অভাবে একটা পর্যায়ে থমকে যায়। তখন আসামিপক্ষ আসামিদের অব্যাহতি চায় এবং অনেক সময় তা পায়।’ প্রতিবেদনের শুরুর দিকে উল্লিখিত মাদক মামলায় দুই আসামির আইনজীবী মো. মনির হোসেন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিরা তদবির (মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া) করে না। সাক্ষীও আসে না। তাই দীর্ঘদিনেও মামলা নিষ্পত্তি হয়নি।’   

সাক্ষ্য দেন কারা, কেন সাক্ষী আসে না : ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১ (২) ধারা এবং পিআরবি’র (পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল) বিধান অনুযায়ী আদালতে সাক্ষী হাজির করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব পুলিশের। এক্ষেত্রে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষী কতজন হবে তা সুনির্দিষ্ট নয়। সাক্ষ্য আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, সাক্ষ্য হতে হবে মৌখিক ও দালিলিক। আর মৌখিক সাক্ষ্য হতে হবে প্রত্যক্ষ কিংবা জনশ্রুত। মামলায় বাদী, ভুক্তভোগী, ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবারের সদস্য ও স্বজন, তদন্তকারী কর্মকর্তা, ক্ষেত্রবিশেষে মেডিকেল সনদ দেওয়া চিকিৎসক, আসামির জবানবন্দি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি, মামলার আলামত জব্দ করেন এমন ব্যক্তি, ঘটনার পর পুলিশের সঙ্গীয় ফোর্স এমন ব্যক্তিরা সাক্ষ্য দেন।

দুজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, ঢাকার আদালতগুলোতে নিয়মিত ফৌজদারি মামলায় শুনানি করেন এমন ৬ জন আইনজীবী, পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ এবং আদালতের কয়েকজন বেঞ্চ কর্মকর্তার (পেশকার) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তাদের প্রায় সবার অভিন্ন পর্যবেক্ষণ হলো, সাক্ষীদের মধ্যে আদালত নিয়ে অস্বস্তি ও ভীতি রয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন বা ভাতা না থাকা, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, কোনো কোনো সাক্ষীর স্থায়ী ঠিকানা না থাকা, সরকারি সাক্ষীদের (ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, পুলিশ, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা) বদলি কিংবা অবসর, সাক্ষীদের মৃত্যু, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমন পাঠাতে উদাসীনতা, আদালত অঙ্গনে সাক্ষীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান ও বিশ্রামের ব্যবস্থা না থাকা এসব নানা কারণে সাক্ষীরা আদালতমুখো হন না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষীদের উদ্দেশ্যে সমন পাঠানো এবং মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাদের হাজিরা ও আদালতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়মিত তদারকি ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমন্বয় করি।’ তিনি বলেন, ‘যেসব মামলার নথিতে মুঠোফোনের নম্বর থাকে সেইসব সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হলেও পুরনো মামলার সাক্ষীদের ঠিকানায় তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। ফলে এই মামলাগুলোতে জটিলতা বেশি হয়।’

সাক্ষী সুরক্ষায় তাগিদ সুপারিশ সবই উপেক্ষিত : ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় আইন কমিশন ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ করতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। এতে এ আইনের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নজির, বিশ্লেষণ করে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে তাগিদ দেয় কমিশন। এর ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় আইনের একটি খসড়া তৈরি করে বলে জানা যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগ থমকে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘদিন সাক্ষী না আসার দরুন একটি হত্যা মামলা অনিষ্পন্ন থাকায় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সাক্ষীদের হাজিরা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে সরকারকে তাগিদ দেয়। তবে, আইন কমিশনের সুপারিশ ও হাইকোর্টের তাগিদেও সেই আইন হয়নি। 

সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন নিয়ে জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

সাক্ষীদের খরচ কেবল আইনের বইতে : ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৪ ধারায় সাক্ষীদের খরচ দেওয়ার বিধান রয়েছে। একসময় জেলা ও দায়রা আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অর্থনৈতিক কোডে (খাত) সাক্ষীকে খরচ বাবদ সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিত। তবে, দুই দশক ধরে তা বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে সাক্ষীদের খরচ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চিঠি দেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। কিন্তু পরে আর এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গত বছরের আগস্টে সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪৪ ধারায় সাক্ষীদের খরচের বিধানে সরকারকে বিধি প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রহিত করে সরকারি আদেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধানের বিষয়টি যুক্ত করা হয়।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় সাক্ষীর স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়। তখন ঘটনার পারিপাশির্^কতা নিয়ে সাক্ষী এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে থাকেন। আদালতে এসে খেই হারিয়ে ফেলেন। যার প্রভাব পড়ে মামলাতে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের সুরক্ষায় আইন নেই। তাদের ভাতা দেওয়া হয় না। আর আদালতগুলোর যে পরিবেশ এবং অবকাঠামো সংকট তাতে সাক্ষী নিরুৎসাহিত হওয়াটাই স্বাভাবিক।’ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, ‘আসলে বিচার বিভাগের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা করতে হবে। সেটা যদি না হয় তাহলে বিচার বিভাগ যে তিমিরে আছে সেখানেই থাকবে।’