এই যুদ্ধের শেষ কোথায়

একই উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন নামে ইরানে দুটি সমন্বিত আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে ইরান পাল্টা হামলা চালালে ২ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ ইসরায়েলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হবে, আর বড়জোর ৩/৪ সপ্তাহ চলতে পারে সংঘর্ষ, এমনটি ধরে নিয়েই এগিয়েছে হামলা শুরু করা দেশ দুটি। তাদের ধারণার তুলনায় তেহরানের সমরবিদরা পাল্টা হামলায় ভিন্ন কৌশল নেওয়ায় মাস গড়িয়ে গেলেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনো নেই।

টিকে থাকতে ইরান পারস্য উপসাগরের আশপাশের দেশগুলোয় যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলে টানা হামলার পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। 

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধ আজ রবিবার দ্বিতীয় মাসে পড়ল। এক মাস ধরে চলমান এ যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভূ-রাজনীতি ও বৈশি^ক অর্থনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় সব দেশ যুদ্ধের অবসান চাইলেও বাস্তবে এর গতিপ্রকৃতি উল্টোমুখী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানে এবারকার অভিযান চার থেকে সাত সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা বলে আসছেন। জি-৭ নামে পরিচিত প্রধান পশ্চিমা অর্থনীতির দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার বলেছেন, তার দেশ ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে’ ইরানে তাদের অভিযান শেষ করার আশা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা বলার পাশাপাশি স্থল ও নৌঅভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। ৮০টির বেশি যুদ্ধবিমান বহন করছে, এমন বিশাল রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আরও কয়েকটি রণতরী চলমান যুদ্ধে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছে। 

অন্যদিকে, ইরান পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরেও এ যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত  স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে গেলে এবং ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পাশাপাশি আরও বিস্তার ঘটানোর  কৌশল ধরে রাখলে কবে নাগাদ এ যুদ্ধ বাস্তবে শেষ হবে, তা এক্ষুণি বলা মুশকিল। আর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া উন্নত ড্রোন ও তথ্য দিয়ে এবং চীন কৌশল ও প্রযুক্তিগত নানা দিক থেকে ইরানকে সহযোগিতা দিতে থাকায় এ যুদ্ধ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকরা। সামরিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউিট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল এএনএম মুনিরুজ্জামান (অব.) দেশ রূপান্তরকে গতকাল শনিবার বলেন, এ যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে পারে, এটা শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এতদিন এটা আকাশ যুদ্ধে সীমিত ছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী মোতায়েন করছে। শেষ পর্যন্ত স্থলযুদ্ধ শুরু হলে এ যুদ্ধ অনেক জটিল হয়ে যাবে। তখন যুদ্ধ সহসা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে পারে। 

তিনি বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এতে করে অর্থনৈতিক মন্দার লক্ষণ দেখা দেবে।

বিশ্ব এক কঠিন সময়ের দ্বারপ্রান্তে, এমন সতর্ক বার্তা উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি-নির্ভর। অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক। এ কারণে আমাদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।’

জেনারেল মুনিরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের উচিত এখন জাতীয়ভাবে বিভিন্নমুখী বিকল্প ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা-পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো। তিনি বলেন, নিরাপত্তা-পরিকল্পনা বলতে অনেকে শুধু সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করে নিরাপত্তার কথা বোঝে। বিষয়টা এমন নয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বিদেশে কর্মসংস্থানসহ অনেক বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। খুব শিগগির এ দিকে নজর না দিলে দেশ বিপদে পড়বে।

ভবিষ্যতে যুদ্ধের প্রকৃতি নির্ধারণে প্রস্তুতির পাশাপাশি বিবদমান দেশগুলো এখনো হামলা ও পাল্টা-হামলা অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রিফুয়েলিং ও নজরদারি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০ জন সেনা। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে দুটি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচশরও বেশি সেনার ওপর হামলা হয়েছে। ইরানের অন্যতম সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি গতকাল এ হামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই সেনারা দুবাইয়ে লুকিয়ে ছিল। তাদের অবস্থান খুঁজে বের করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে সেনারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

কুয়েতের রাজধানীতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার সিস্টেম ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত একের পর এক ড্রোনের আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল রাজহি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ওমান সালালাহ বন্দর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক সহায়তা জাহাজে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। ইরানিদের দাবি, এর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এদিকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোয়  প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে হামলা হওয়ার ব্যাপারে আবারও সতর্ক করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এসব হামলার ভয়াবহ জবাব ইরান দেবে, এটা জানিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি নিজেদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান, তবে আমাদের শত্রুদের আপনাদের দেশ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার সুযোগ দেবেন না।’ 

হুতিরাও যুদ্ধে জড়াল : প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। এর মধ্য দিয়ে এক মাস ধরে চলা যুদ্ধ নতুন  মোড় নিয়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানেও বড় ধরনের বিমান হামলা হয়েছে।

ইরানে হামলা অব্যাহত থাকলে হস্তক্ষেপ করার হুমকি দেওয়ার একদিন পরই ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল হুতিরা।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযানে গেলে হুতিদের সহায়তায় লোহিত সাগরের মুখে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি ‘বাব আল-মান্দেব’ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইরান।

আলোচনার চেষ্টা অব্যাহত : পাকিস্তান যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আজ রবিবার ও আগামীকাল সোমবার ইসলামাবাদে বৈঠক করবেন।

যুক্তরাষ্ট্র এবার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে অভিযান শুরু করে, প্রধানত ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভা-ার ও উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করা, নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করাও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় রয়েছে।

ইসরায়েলের এবারকার অভিযান গত বছর জুনে চালানো ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এর সম্প্রসারণ। হামলায় দেশটির মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের মতোই। তবে ইসরায়েলের অতিরিক্ত আরেকটি লক্ষ্য আছে, তা হলো- ইরানে শাসক-গোষ্ঠী বদলানো।

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ প্রায় ১ হাজার ৯৩৭ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মিলিয়ে ১৭৫ জন রয়েছেন। ইরানে এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার।

ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রি’ নামে পাল্টা অভিযান পরিচালনা করছে। দেশটি ইসরায়েলের বাইরে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনা নিহত ও অন্তত ৩০০ আহত হয়েছে। ইসরায়েলের ১৯ নাগরিক নিহত হয়েছে; আহত প্রায় ৫ হাজার। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন ১৪ জন। 

মধ্যপ্রাচ্যে এবারকার যুদ্ধের কারণে দেশে-দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ থেকে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত। মানুষের ভোগান্তিও তাতে বেড়েছে।