‘স্বাধীনতা’র মিছিলের গল্প

‘স্বাধীনতা’ এই চার অক্ষরের বর্ণমালা বুকে ধারণ করে রাজপথে বেরিয়ে আসে বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ। অসহযোগের উত্তাল সময়ে এ ধরনের মিছিলের করা আয়োজন ছিল এক দুঃসাহসী কর্মসূচি। বাংলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ এই ব্যতিক্রমী মিছিলের আয়োজন করে। শিল্পীদের আঁকা কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র, ফেস্টুন, ব্যানার ও পোস্টারগুলো যেন ওইসময় পাকিস্তানিদের সামনে রাইফেল, গ্রেনেড, কামান ও বোমার মতো বিস্ফোরক হয়ে হাজির হয়। বিক্ষুব্ধ শিল্পীদের মিছিলের ছবিটি পরের দিন দেশের সব পত্রিকায় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। পরবর্তী সময়ে ছবিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি আইকনিক ছবিতে পরিণত হয়।

ছবিটি নিয়ে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদারের একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্ণনাটি ছাপা হয় ২০০৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদক শিখ্তি সানীকে রশীদ তালুকদার বলেছিলেন, ‘একাত্তরের মার্চ মাস ছিল উত্তাল। সারা দিন ভেসপা নিয়ে ছবির খোঁজে রাস্তায়। নিজের কাছে একটা দায়বোধ তো ছিলই। দিন শেষে আমার দৈনিক সংবাদ-এর জন্য ছবি রাখতে হবে। আন্দোলনের মূল জায়গা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের আশপাশের এলাকা। ১৬ মার্চ বিকেলের দিকে তৎকালীন আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর কাছে স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে মিছিল বের করেন। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। “স্বা-ধী-ন-তা” আলাদা আলাদা প্ল্যাকার্ডে রাঙিয়ে মিছিল বের হয়।... এ মিছিলগুলোই আমাদের ইতিহাসকে অন্যরকম করে দিয়েছে।’ ঐতিহাসিক এই ছবিটি নিয়ে এতটুকুই তথ্য ছিল একপৃষ্ঠা জুড়ে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদনে।

স্বাধীনতার জন্য চিত্রশিল্পীদের রাস্তায় বের হয়ে আসার ঘটনাটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। জানতে ইচ্ছে করে ছবির মানুষগুলো কারা? কিংবা কোন পরিস্থিতিতে শিল্পীরা গড়লেন সরকারবিরোধী এই নন্দিত মিছিল? কয়েক বছর আগে কে যেন একবার আমাকে বলেছিলেন, শিল্পীদের এই মিছিলে কবি সুফিয়া কামালের দুই কন্যা সুলতানা কামাল লুলু ও সাঈদা কামাল টুলু রয়েছেন। ঘটনার বিস্তারিত জানতে আমি সুলতানা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সাদাকালো ছবিটির একটি প্রিন্ট নিয়ে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর সকালে গিয়ে হাজির হই ধানম-ি সাঁঝের মায়ায়। ছবিটি দেখিয়ে জানতে চাই কে কে আছেন এই ছবির ভেতর? ছবিটি হাতে নিয়ে সুলতানা কামাল ফিরে গেলেন ৫৫ বছর আগে, তার সবচেয়ে সোনালি বেলায়।

সুলতানা কামাল বললেন, ‘বহু বছর আগের ঘটনা। তবু কাউকে কাউকে শনাক্ত করতে পারছি।

নামগুলোও মনে করতে পারছি। কারও কারও পুরো নাম মনে নেই। তবে তখনকার পরিস্থিতি এখন বর্ণনা করে বোঝানো সম্ভব নয়। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগের ডাক দিলেন। তারপর থেকেই একেবারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে না হলেও আমাদের কার্যকলাপ, কথাবার্তা, বক্তব্য ও বক্তৃতার মাধ্যমে পাকিস্তানিদের জানিয়ে দিচ্ছি তোমাদের সঙ্গে আমরা আর থাকছি না। আলাদা হয়ে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ১২ মার্চ বাংলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। তাদের উদ্যোগেই এই মিছিলের আয়োজন করা হয়। এই মিছিলে কিন্তু আমার থাকার কথা নয়। আমি আর্ট কলেজের কেউ না। আমি তখন পড়তাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে। আমার ছোট বোন টুল ছিল আর্ট কলেজের ছাত্রী। সে শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। টুলু যাবে শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না। তাকে একা ছাড়া যায় না। তাই টুলুর সঙ্গে আমিও গেলাম। বিকেল ৩টায় গিয়ে হাজির হলাম শহীদ মিনারের সামনে।’

স্মৃতি হাতড়ে সুলতানা কামাল বললেন, সরকারবিরোধী এই কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তার সঙ্গে শিল্পী মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খানসহ অনেকে ছিলেন। মিছিলের আগে একটি সংক্ষিপ্ত সভা হলো। সভায় জয়নুল আবেদিন ও মুর্তজা বশীর বক্তব্য রাখলেন। যখন মিছিলটা বের হবে, তখন সিদ্ধান্ত হলো মিছিলের অগ্রভাগে ‘স্বা’, ‘ধী’, ‘ন’, ‘তা’ এই চারটি বর্ণমালা চারজনের হাতে থাকবে। তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। শহীদ মিনারের আশপাশে পাকিস্তানি সেনারা বন্দুক হাতে টহল দিচ্ছে। আর গোয়েন্দাদের নজরদারি তো আছেই। এ রকম পরিস্থিতিতে কে কী করবে বুঝতে পারছে না। চারটি কালো বোর্ডে সাদা কালিতে লেখা ‘স্বা’, ‘ধী’, ‘ন’, ‘তা’। টুলু বলল, সে ‘স্বা’ ধরবে। শোভা বলল, ‘ধী’ ধরবে। ফেরদৌসী পিনু ধরল ‘ন’। এখন ‘তা’ অক্ষরটা কে নেবে তেমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আমি বললাম, কারও যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে আমি ‘তা’টা ধরতে পারি। আয়োজকরাও রাজি হয়ে গেলেন।

ছবির মানুষগুলোকে ধরে ধরে সুলতানা কামাল বলতে লাগলেন, টুলুর পাশে ‘শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েম কর’ প্ল্যাকার্ডটি ধরে আছেন ভাস্কর শামীম সিকদার। তার ডান পাশে শিল্পী আবদুল বাসিত। আর আমার পাশে সায়মা মনসুর। শোভা ও পিনুর মাঝখানে সায়মার মা। সায়মা তখন আর্ট কলেজে পড়ত। পরবর্তী সময়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হয়। সায়মার পাশে সম্ভবত আর্ট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ময়েজ উদ্দিন। ‘শ্রমিক কৃষক ছাত্র-জনতা এক হও’ প্ল্যাকার্ড হাতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমদ। মিছিলটির পেছনের দিকে আছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও শাহাদত চৌধুরী [পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক]। ‘তোর জুতাটাও নিয়ে যা’ ব্যঙ্গচিত্রটি দেখিয়ে বললেন, এটি এঁকেছিলেন শিল্পী রফিকুন নবী। শোভার ছবিটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন সুলতানা কামাল। বললেন, ‘শোভার কথা প্রায় মনে পড়ে। সে আর্ট কলেজের ছাত্রী ছিল না। গান গাইত ওয়াহিদুল হকের দলে। ওয়াহিদুল হকের সঙ্গেই সে মিছিলে এসেছিল। ওই মিছিলের মাত্র ১০ দিন পর ২৬ মার্চ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় শোভা।’

আরেকটি নতুন তথ্য দিলেন সুলতানা কামাল। বললেন, ‘৭ মার্চের ভাষণটা যদি খুব ভালো করে বিশ্লেষণ করি, তাহলে স্পষ্ট করে বোঝা যায়, ওই ভাষণের মধ্যে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাই ছিল। এই ঐতিহাসিক ভাষণের পর প্রতি মুহূর্তেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও না কোথাও সভা হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এসবের পেছনে আর্ট কলেজে একটা বিরাট অবদান ছিল। আর্ট কলেজের ভেতর সংস্কৃতির বড় একটা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। সেখানে গান ও নাটকের মহড়া হতো। আলতাফ মাহমুদ ও শেখ লুৎফর রহমান ওই মহড়ায় আসতেন। ওখানে বসে তারা প্রতিবাদী গান শেখাতেন। আমরা ওই সময়ে সর্বক্ষণই রাস্তায় ছিলাম। তখন আমাদের ভাষাই ছিল ওই মাঠে দেখা হবে পল্টন, সোহরাওয়ার্দী কিংবা শহীদ মিনারে।’

শিল্পীদের এই প্রতিবাদী মিছিলের ছবি ও সংবাদটি কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল, তা জানতে ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোর দিকে চোখ রাখি। সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয় ছবি ও সংবাদ। দৈনিক পূর্বদেশ শিরোনাম করে ‘শিল্পীর তুলি বন্দুকের চেয়েও তীক্ষè’। দৈনিক পাকিস্তান-এর শিরোনাম ‘শিল্পী সমাজের বজ্র শপথে রাজপথ প্রকম্পিত’। মিছিলে চারু ও কারুকলা কলেজের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের আঁকা ৩৫টির মতো কার্টুন, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিল। সব কার্টুনেই ছিল ওই সময়ের বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র। মিছিলের কয়েকটি কার্টুন ও ফেস্টুনের ভাষা ‘হবুচন্দ্র আর গবুচন্দ্র’, বিদ্রোহ চারদিকে বিপ্লব আজ’, তল্পী এবার গুটাও ভাই, বাঁদর নাচ ক্ষান্ত দাও’, ‘ডন কুইকসট পগার পার’, ‘একচেটিয়া পুুঁজিবাদ খতম কর’, ‘আমার দেশের ফসল নিয়েছ তুমি, আমাকে দিয়েছ সমূহ সর্বনাশ, তোমার ওখানে মরুতে ফসল এল, শুধু অনাহারে কেটেছে আমার দিন’ প্রভৃতি।

সরকারবিরোধী ব্যানার, কার্টুন ও ফেস্টুনে সজ্জিত শিল্পীদের এ মিছিলটি বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের আগে যে সমাবেশ হয়, তাতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আবেগ কম্পিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার সবুজ দেশে আজ রক্তের প্লাবন। এই সবুজের দেশে যারা বুকের রক্তের লাল রঙ রেখে গেছেন তাদের প্রাণের বাণীকে, তাদের সংগ্রামকে আমরা তুলির মাধ্যমে মূর্ত করে তুলব।’ স্বাধিকার সংগ্রামকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে চরম ত্যাগ স্বীকারের জন্য তিনি শিল্পীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই। এ লড়াইয়ে শিল্পীদের অদম্য মনোবল আর দেশপ্রেমের অনন্যকীর্তি এক গর্বিত ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।