‘ঢাকাত যাওয়ার সময় হামার ব্যাটা বারে বারে কয়, আব্বা তোমার ঢাকায় যাওয়ার দরকার নাই। হামি আর মা এক সঙ্গে যাচ্ছি। চাকরি করা ট্যাকা দিমো, তুমি বাড়িত থাকি সংসার দেখবা। আমাদের আর অভাব থাকবে না। সেই সপনো হামার কি হলো রে। ব্যাটা দিবে হামাক মাটি, আজকে হামাক দেওয়া নাকছে ব্যাটাকে মাটি।’ এভাবে প্রলাপ বকতে বকতে গতকাল শনিবার ছেলে ও স্ত্রীর জানাজায় অংশ নিতে প্রতিবেশীর কাঁধে ভর করে গেলেন রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান।
গত শুক্রবার টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয় গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামানের স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫) ও তাদের ১১ বছরের ছেলে নীরব মিয়া। ওই দুর্ঘটনায় তাদের বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগমও মারা যান। গতকাল শনিবার সকাল ৮টায় পাঁচটি মরদেহ নিজপাড়া গ্রামে পৌঁছালে শুরু হয় শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে তখন আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি চলছিল।
স্ত্রী, সন্তানকে হারিয়ে পাগল প্রায় হামিদুজ্জামান বলেন, ‘হামার বউ ছোল সবি গেল, পাঁচ দিন আগত বড় ব্যাটাক বিয়া করাচি। ব্যাটার শাশুড়িও মরি গেল। কালকা রাতোত ওই খানে (ঘটনা স্থল) থাকি মোবাইলে হামার এক বন্ধু কয়, তোর ব্যাটা আর বউ নাইরে। একসাতে সগলে মলো। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব।’
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রাম। শনিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম জুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে চলছে কান্না ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি। আশপাশের লোকজন নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, হামিদুজ্জামান রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। অভাবের সংসারে। স্বচ্ছলতা আনতে প্রায় ৬ বছর আগে স্বামীকে গ্রামের বাড়িতে রেখে ঢাকায় যান নার্গিস বেগম। পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দেন। এক ছেলেকে নিয়েই ঢাকায় থাকতেন তিনি। এই দম্পতির বড় ছেলে নাঈম মিয়ার সঙ্গে গত পাঁচ দিন আগে বিয়ে হয় পোশাক শ্রমিক নিহত দোলা বেগমের মেয়ে জুইয়ের। নতুন দম্পতিকে এলাকায় রেখে দুই বিয়ান নার্গিস বেগম ও দোলা বেগম পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে একসঙ্গে বাসযোগে ঢাকা রওনা হন । কিন্তু তাদের এই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় বিষাদে গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে তেল ফুরিয়ে যায়। এতে বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এ সময় বাস থেকে তারা নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসেছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে নার্গিস বেগম ও তার ছেলে নীরবসহ পাঁচজন নিহত হন।