বইয়ের বিশ্ব আজ মুষ্টিমেয় কিছু শক্তিশালী করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ, যাদের ‘বিগ ফাইভ’ বলা হয়। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি পাবলিশিং হাউজ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
একটি বই যখন আমাদের হাতে পৌঁছায়, আমরা সাধারণত লেখকের নাম আর প্রচ্ছদের কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু এই রঙিন মলাটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য, যেখানে সাহিত্য শুধু সৃজনশীলতা নয় বরং কয়েক বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, ভূ-রাজনীতি আর ক্ষমতার এক অদৃশ্য খেলা। বর্তমান বিশ্বের প্রকাশনা জগৎ এখন আর কেবল ছোট ছোট ছাপাখানায় বা ধুলোবালি মাখা লাইব্রেরিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন গ্লোবাল করপোরেশন বা দানবীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের করায়ত্ত। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউজ, হার্পার কলিন্স বা সাইমন অ্যান্ড শুস্টারের মতো নামগুলো আজ কেবল বই প্রকাশক নয়, তারা বিশ্ব জুড়ে মানুষের চিন্তার গতিপথ এবং সাংস্কৃতিক রুচি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এই বিশাল যজ্ঞে লেখকের কলম যতটা শক্তিশালী, তার চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে প্রকাশকের বিপণন কৌশল আর বাজারের সমীকরণ।
প্রকাশনা জগতের মহিরুহ
বিশ্বের প্রকাশনা বাজার বর্তমানে গুটিকয়েক দানবীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দি, যাদের বিশেষজ্ঞ মহলে ‘বিগ ফাইভ’ বলে ডাকা হয়। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কেবল বই ছাপায় না, বরং তারা বিশ্ব জুড়ে মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি এবং তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই তালিকার শীর্ষে থাকা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউজ কার্যত একাই বাজারের এক বিশাল একচ্ছত্র অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। জার্মানির বারটেলসম্যান গ্রুপের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক দশকে কয়েকশ ছোট-বড় প্রকাশনীকে নিজের ভেতরে গিলে নিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এদের অধীনে রয়েছে প্রায় ৩০০টিরও বেশি স্বাধীন ইম্প্রিন্ট বা শাখা প্রকাশনী। এদের প্রভাব এতটাই বেশি যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে আপনি যদি কোনো ইংরেজি বেস্টসেলার বই কেনেন, তার বড় একটি সম্ভাবনা থাকে সেটি এই হাউজেরই কোনো না কোনো শাখা থেকে বের হয়েছে।
দ্বিতীয় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে হার্পার কলিন্স। এটি বিশ্বখ্যাত মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডকের ‘নিউজ করপোরেশন’-এর একটি অংশ। হার্পার কলিন্সের বিশেষত্ব হলো তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক; তারা ১৭টিরও বেশি ভাষায় বই প্রকাশ করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের নিজস্ব শাখা অফিস রয়েছে। তাদের লক্ষ্য থাকে কেবল সাহিত্য নয়, বরং ব্যবসা এবং ধর্মীয় বইয়ের বাজারকেও ধরা। বিশেষ করে ‘জন্ডারভান’-এর মতো প্রকাশনীকে অধিগ্রহণ করে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাইবেল প্রকাশকে পরিণত হয়েছে। তাদের অর্থ আর গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের জোরে একজন সাধারণ লেখকের পা-ুলিপি রাতারাতি গ্লোবাল বেস্টসেলার হয়ে উঠতে পারে।
ফরাসি মিডিয়া জায়ান্ট হাশেত লিভ্রে এই তালিকার আরেকটি বড় নাম। এটি মূলত একটি বিশাল বহুজাতিক কোম্পানি ‘লাগাদে’-এর অংশ। হাশেত কেবল ফিকশন বা গল্পের বইতেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা শিক্ষা এবং পাঠ্যপুস্তকের বাজারে বিশ্বের অন্যতম বড় শক্তি। ইউরোপীয় বাজারে তাদের আধিপত্য এতটাই প্রবল যে, অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় ছোট প্রকাশকদের জন্য টিকে থাকাই কঠিন করে তোলে। তাদের মার্কেটিং কৌশলগুলো মূলত হাই-প্রোফাইল লেখকদের কেন্দ্র করে সাজানো থাকে, যা বাজারে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মনোপলি বা একচেটিয়া ভাব তৈরি করে।
তালিকায় এর পরেই আসে সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, যারা দীর্ঘকাল ধরে হলিউড এবং মার্কিন পপ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমান সময়ে তারা তাদের থ্রিলার, রাজনৈতিক বই এবং জীবনীগ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অনেক বড় বড় বিতর্কিত বই এই হাউজ থেকেই প্রকাশিত হয়। অনেক চড়াই-উতরাই আর মালিকানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও তারা তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, যেকোনো বড় সেলিব্রিটি তাদের জীবনের গল্প বলতে প্রথমে এই হাউজেরই দ্বারস্থ হন।
পঞ্চম দানবীয় শক্তি হলো ম্যাকমিলান পাবলিশার্স। এটি জার্মানির হোলৎসব্রিংক পাবলিশিং গ্রুপের মালিকানাধীন। ম্যাকমিলান মূলত একাডেমিক এবং সিরিয়াস লিটারেচারের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাদের অধীনে থাকা ‘নেচার’ বা ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর মতো জার্নালগুলো বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞান চর্চার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। একদিকে তারা যেমন বাণিজ্যিক ফিকশন ছাপে, অন্যদিকে তারা সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচিও নিয়ন্ত্রণ করে।
এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বা ‘বিগ ফাইভ’ কেবল বই ছাপে না, তারা লেখক ও সেলিব্রিটি তৈরি করে। তাদের হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ পুঁজি আর গ্লোবাল নেটওয়ার্কের জোরে তারা ঠিক করে দেয় কোন বইটি আগামী মাসে সারা বিশ্বের এয়ারপোর্টের বুকস্টলগুলোতে দেখা যাবে। তবে এই প্রবল প্রতিযোগিতার ভিড়ে অনেক গভীর, জীবনমুখী এবং নিরীক্ষামূলক সাহিত্য হারিয়েও যায়। কারণ, এই করপোরেট দানবদের কাছে পান্ডুলিপির সাহিত্যমানের চেয়ে তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বা ‘মার্কেটেবিলিটি’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নির্ধারিত করপোরেট ছকে যে লেখা খাপ খায় না, তা অধিকাংশ সময় আলোর মুখ দেখে না। ফলে বৈচিত্র্যের চেয়ে এখানে মুনাফাই প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আধিপত্যের কারণে ছোট বা স্বাধীন প্রকাশকরা আজ কোণঠাসা, যা বিশ^ সাহিত্যের দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীলতার জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
বিবর্তন
প্রকাশনা শিল্পের বিবর্তনের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। এক সময় এটি ছিল ব্যক্তিগত শখ, সামাজিক দায়বদ্ধতা বা ছোট ছোট পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু হয় মার্জার বা একীভূতকরণের এক আগ্রাসী জোয়ার। ছোট ছোট স্বাধীন প্রকাশনীগুলো, যারা এক সময় ভিন্নধর্মী ও নিরীক্ষামূলক সাহিত্য প্রচার করত, তারা ধীরে ধীরে বড় বড় মিডিয়া হাউজের অংশে পরিণত হতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, পেঙ্গুইন এবং র্যান্ডম হাউজের একীভূত হওয়া ছিল বিশ^ প্রকাশনা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়, যা পুরো ইন্ডাস্ট্রির ভারসাম্য বদলে দেয়। এই পরিবর্তনের ফলে প্রকাশনা হয়ে উঠেছে একটি ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’। এখন একটি বই প্রকাশের আগে তার সাহিত্যমানের চেয়ে বেশি বিচার করা হয় তার বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা এবং বিপণনযোগ্যতাকে। সৃজনশীলতার চেয়ে ডাটা অ্যানালাইসিস এবং প্রি-অর্ডার সংখ্যা আজ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে প্রকাশনা আজ কেবল জ্ঞান বিতরণের পবিত্র মাধ্যম নয়, বরং এটি স্টকম মার্কেটের লাভ-ক্ষতির এক জটিল গাণিতিক সমীকরণ।
বেস্টসেলার সংস্কৃতি
বর্তমান যুগে প্রকাশনা ব্যবসার মূল অক্সিজেন হলো বেস্টসেলার সংস্কৃতি। হ্যারি পটার সিরিজ, ড্যান ব্রাউনের থ্রিলার বা বিভিন্ন সেলফ-হেল্প বইয়ের যে জোয়ার আমরা দেখি, তার পেছনে থাকে প্রকাশকদের কোটি কোটি টাকার মার্কেটিং বাজেট। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়, প্রকাশকরা কি পাঠকের সহজাত রুচি অনুযায়ী বই সরবরাহ করে, নাকি তারা সুকৌশলে পাঠকের রুচি তৈরি করে দিচ্ছে? বাস্তবতা হলো, বড় প্রকাশনীগুলো বিপুল অর্থ খরচ করে নির্দিষ্ট কিছু বইকে এতটাই জনপ্রিয় করে তোলে যে, সাধারণ পাঠকরা সেগুলো পড়তে এক প্রকার বাধ্য বোধ করেন। একে বলা হয় ‘ম্যানুফ্যাকচারড পপুলারিটি’। অনেক সময় অত্যন্ত উচ্চমানের সাহিত্যিক কাজ এই চটকদার বিপণনের ভিড়ে আড়ালে পড়ে থাকে। ‘কী বিক্রি হবে’ বনাম ‘কী পড়া উচিত’ এই চিরন্তন দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ সময় মুনাফারি জয়ী হয়, যা বিশ্ব জুড়ে সাহিত্যচর্চার গভীরতাকে কিছুটা হলেও সংকুচিত করছে।
লেখক ও প্রকাশক
একজন নতুন বা উদীয়মান লেখকের কাছে বড় প্রকাশনীর লোগো মানেই এক সোনার হরিণ। কিন্তু এই প্রাপ্তির পেছনের সমীকরণটি অত্যন্ত কঠিন। অ্যাডভান্স পেমেন্ট বা রয়্যালটির হিসাব-নিকাশ এখানে খুব চড়া এবং বৈষম্যমূলক। জাঁদরেল বা প্রতিষ্ঠিত লেখকরা যেখানে কোটি টাকার আগাম চুক্তি করেন, সেখানে নতুনদের টিকে থাকতে হয় অত্যন্ত প্রতিকূল শর্তে। ইদানীং বাজারে ‘সেলিব্রিটি বুক’ বা ‘ঘোস্ট রাইটিং’-এর প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নামকরা খেলোয়াড়, অভিনেতা বা রাজনীতিবিদদের নামে পেশাদার লেখকদের দিয়ে বই লিখিয়ে প্রকাশকরা দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়। এতে সত্যিকারের মেধাবী লেখকদের সুযোগ কমে যাচ্ছে। লেখক এবং প্রকাশকের এই সম্পর্কটি এখন আর শুধু সৃজনশীল সাহচর্য বা সাহিত্যের আদান-প্রদান নয়, বরং এটি একটি নিরেট পেশাদার চুক্তি যেখানে লেখকের সৃজনশীল সত্তার চেয়ে প্রকাশকের বাণিজ্যিক দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক বেশি প্রবল।
ভাষার রাজনীতি
বিশ্ব প্রকাশনা জগতে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য আজ একচ্ছত্র। একে আধুনিক যুগের এক ধরনের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ বললে ভুল হবে না। গ্লোবাল সাউথ বা আফ্রিকা-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার লেখকরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাক্সিক্ষত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান না, যতক্ষণ না কোনো বড় পশ্চিমা প্রকাশনী তাদের বই ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে বাজারে আনছে। এই লিঙ্গুইস্টিক ডমিন্যান্স বা ভাষার রাজনীতির কারণে বাংলা সাহিত্যের মতো হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অনেক কালজয়ী সৃষ্টিও বিশ্বপাঠকের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। অনুবাদের বাজারটিও মূলত পশ্চিমমুখী এবং একপাক্ষিক। পশ্চিমা প্রকাশকরাই ঠিক করে দেয় কোন দেশের কোন ধরনের গল্পটি বিশ্ববাসী জানবে বা পড়বে। অনেক সময় তারা নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক এজেন্ডা বা ‘একজোটিক’ দৃষ্টিভঙ্গির বইগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়, যা প্রকৃত জীবনচিত্রকে বিকৃত করতে পারে।
ডিজিটাল বিপ্লব
আমাজন এবং সেলফ-পাবলিশিংয়ের উত্থান প্রথাগত প্রকাশনা জগতের মজবুত ভিতকে কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখন একজন লেখক চাইলেই কোনো বড় হাউজের দুয়ারে মাসের পর মাস ধরনা না দিয়ে সরাসরি ই-বুক বা অডিও বুক আকারে নিজের কাজ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। এই ডিজিটাল বিপ্লব প্রকাশকদের একচেটিয়া ক্ষমতায় কিছুটা চিড় ধরালেও, কাগজের বইয়ের আদিম আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বই লেখা এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির পাঠকদের টার্গেট করার যে নতুন প্রযুক্তিগত ধারা শুরু হয়েছে, তা আগামীর প্রকাশনা শিল্পকে আমূল বদলে দিতে পারে। সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক চাপ এবং ডাইভারসিটি ইস্যু বা বৈচিত্র্যের অভাব এখনো এই শিল্পে বড় বিতর্ক হিসেবে টিকে আছে। তবে সব ছাপিয়ে প্রশ্নটি থেকেই যায় আমরা যা পড়ছি তা কি লেখকের স্বাধীন চিন্তা, নাকি বৃহৎ প্রকাশকের সাজানো কোনো গোলকধাঁধা?