ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান সমকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে নিছক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তা মার্কিন সমাজে দীর্ঘকাল ধরে সুপ্ত থাকা উগ্র ডানপন্থি জাতীয়তাবাদ ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মানসিকতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। তার রাজনৈতিক দর্শনের গভীর বিশ্লেষণ করলে অবধারিতভাবেই বিংশ শতাব্দীর কুখ্যাত একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ওয়াশিংটনের রাজপথে প্রতিবাদীদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘ট্রাম্প এই যুগের হিটলার’ স্লোগানটি কেবল একটি রাজনৈতিক অপবাদ নয়, বরং এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভাঙন নিয়ে এক গভীর ঐতিহাসিক উদ্বেগেরই সুর। তার বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা ও বিভাজনমূলক নীতিসমূহ মূলত ঘৃণা ও সংঘাতের রাজনীতিকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে, যা উদারবাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং বিশ্বশান্তির জন্য এক অশনি সংকেত। হিটলারের জার্মানিতে ‘গোয়েবলসীয়’ প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করে মিথ্যাকে বারবার সত্যে পরিণত করার যে অপচেষ্টা হতো, ট্রাম্পের রাজনৈতিক হাতিয়ারেও তারই অবিকল প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান।
ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তরের অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাম্প হিটলার যুগের কৌশল অবলম্বন করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার ছড়িয়েছেন তা পারমাণবিক আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার চক্রান্ত হোক কিংবা কোনো হীন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টাই হোক। নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তোলা, স্বাধীন গণমাধ্যমকে ‘জনগণের শত্রু’ আখ্যা দেওয়া এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা এগুলো মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য এক ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক পরীক্ষা। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে বিরোধী দলকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের হুমকি দেওয়া, হিটলারের জার্মানির অন্ধকার ছায়াকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০১৫ সালে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই ট্রাম্প সুকৌশলে ইসলামভীতি বা ‘ইসলামোফোবিয়া’ উসকে দিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, তাদের তালিকাভুক্ত করা বা মসজিদ নজরদারিতে রাখার মতো চরমপন্থি বক্তব্য তিনি অকপটে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রক্রিয়াটি নাৎসি বাহিনীর ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ট্রাম্প ভালো করেই জানেন, আমেরিকার সমাজের একাংশের গভীরে লুকিয়ে থাকা বর্ণবাদী মানসিকতাকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই ক্ষমতার মসনদ সুরক্ষিত হবে। মূলত, ২০৪৪ সালের মধ্যে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার যে জনতাত্ত্বিক ভীতি, তাকেই তিনি চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছেন। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র তাস খেলে তিনি বিভেদের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মস্থান বা ধর্ম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করাও মূলত সেই বর্ণবাদী মানসিকতারই অংশ, যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন কোনো অশ্বেতাঙ্গ আমেরিকার ভাগ্যবিধাতা হতে পারেন না।
নিজেদের বিদ্বেষমূলক নীতির পক্ষে যুক্তি প্রদান করতে গিয়ে ট্রাম্প শিবির আমেরিকার ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। ১৯৪২ সালে লক্ষাধিক জাপানি-আমেরিকানকে বন্দিশিবিরে আটকে রাখার কলঙ্কময় ঘটনার জন্য মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছিল, তবে ট্রাম্পের সহযোগীরা সেই ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তাদের মুসলিম-বিরোধী নীতির গোপন সমর্থন দিতে চেষ্টা করেছেন। অভিবাসীদের অযথা ‘ধর্ষক’ বা ‘মাদক চোরাচালানকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি দেখিয়েছেন, মানবাধিকারের চেয়ে তার কাছে ক্ষমতার দাম অনেক বেশি। হিটলার যেমন সাধারণ জার্মানদের বুঝিয়েছিলেন তাদের যাবতীয় দুর্দশার মূলে রয়েছে অন্য জাতি, ট্রাম্পও ঠিক একইভাবে আমেরিকানদের মগজ ধোলাই করার চেষ্টা করছেন এই বলে যে অভিবাসীরাই তাদের যাবতীয় সংকটের প্রধান কারণ। তার বিতর্কিত ‘জিরো টলারেন্স’ অভিবাসন নীতির অধীনে মেক্সিকো সীমান্তে অবুঝ শিশুদের পিতামাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার নির্মমতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ বা নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিছক কোনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতি নয়, বরং এটি কাঠামোগত বিভেদ সৃষ্টির এক সুপরিকল্পিত কৌশল। ট্রাম্পের বহুল চর্চিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে হিটলারের ‘আর্য জাতি’র শ্রেষ্ঠত্বের ধারণারই সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এ ছাড়া বারবার মূলধারার গণমাধ্যমকে ‘ফেক নিউজ’ তকমা দিয়ে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভকে ধ্বংসের অপচেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে বিভ্রান্তির জাল বোনা যেন সেই হিটলারের প্রচারমন্ত্রীর কৌশলের কথাই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের আগ্রাসী কূটনীতি ও একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত বিশ্বশান্তির জন্য এক মারাত্মক হুমকি। ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহার, তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও ইসরায়েলকে অন্ধ সমর্থনের মাধ্যমে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতাকে আরও উসকে দিয়েছেন। অন্যদিকে, জেফ্রি এপস্টাইনের মতো দাগি অপরাধীর সঙ্গে পুরনো সখ্য এবং ফ্লাইট লগে নাম থাকার বিষয়টি তার ব্যক্তিগত চরিত্রের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। নারী অধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো প্রগতিশীল জায়গা থেকেও তিনি আমেরিকাকে যোজন যোজন পেছনে টেনে নিচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনকে অবজ্ঞা করা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সাময়িক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের বেদিতে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নির্দ্বিধায় বলি দিচ্ছেন। আমেরিকার মুক্তি ও স্বাধীনতার চিরকালীন ইতিহাস বর্তমানে ট্রাম্পের সংকীর্ণ ও বিভক্তিকর রাজনীতির কারণে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যদি ভয় ও ঘৃণা পরাজিত না হয়, তবে আমেরিকা তার নিজস্ব গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে এক নিষ্ঠুর স্বৈরশাসনের গহ্বরে পতিত হবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক পুনরুত্থান আধুনিক সভ্যতার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা এটি নির্দেশ করে যে, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে স্বৈরশাসনের চরিত্রের পুনর্জন্ম অসম্ভব নয়। অতএব, ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করতে আমাদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থেকে যে কোনো নেতার ক্ষমতার অহংকারের চেয়ে চিরকালীন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই সবার ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে হবে।
লেখক : সহকারী শিক্ষক ও কলামিস্ট
amanurrahman.world@gmail.com