বোনের যত্ন নেওয়া জান্নাত লাভের মাধ্যম

মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. মাহের আল-মুআইকিলি তাকওয়া অবলম্বনের মাধ্যমে পরকালীন সফলতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাই নফসকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং কেবল তার সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হিসেবে অভিহিত করে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, নম্রতা, সহনশীলতা এবং কন্যা ও বোনদের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং যতœ নেওয়া জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

শায়খ বলেন, হে মুমিনরা! আমি নিজেকে এবং আপনাদের মহান আল্লাহর তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। সুতরাং সর্বদা আনুগত্যের মাধ্যমে এবং হারাম কাজ বর্জনের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে ভয় করুন। যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করেছে সেই সফল হয়েছে, আর যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর প্রত্যেকের উচিত লক্ষ করা যে সে আগামীকালের (পরকালের) জন্য কী প্রেরণ করেছে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা হাশর ১৮)

হে মুসলিম জাতি! প্রকৃত সফলতা হলো নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করা। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষই প্রতিদিন সকালে তার নফসের কেনাবেচায় লিপ্ত হয়, হয় সে তাকে (আনুগত্যের মাধ্যমে) মুক্ত করে, অথবা (পাপের মাধ্যমে) ধ্বংস করে। জান্নাতে প্রবেশ ছাড়া এই সফলতা পূর্ণ হয় না, যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম হবে। আর পার্থিব জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছু নয়।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮৫)

জাহান্নাম প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা দ্বারা ঘেরা, আর নফস বা মন সর্বদা প্রবৃত্তির দিকেই ঝোঁকে। তাই কষ্ট ও সাধনা ছাড়া মানুষ তা থেকে ফিরে আসতে পারে না। সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যখন মহান আল্লাহ জাহান্নাম সৃষ্টি করলেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে বললেন, যাও, এটি দেখে এসো। তিনি দেখে এসে বললেন, হে আমার রব! আপনার ইজ্জতের কসম, যেই এর কথা শুনবে সে এতে প্রবেশ করবে না। এরপর আল্লাহ জাহান্নামকে প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা দিয়ে ঘিরে দিলেন এবং বললেন, হে জিবরাইল! এবার গিয়ে দেখে এসো। তিনি দেখে এসে বললেন, হে আমার রব! আপনার ইজ্জতের কসম, আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, কেউই এটা থেকে রক্ষা পাবে না (সবাই এতে প্রবেশ করবে)।

হে ইমানদার ভ্রাতারা! মহান আল্লাহ যেমন রমজান মাসকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির মৌসুম বানিয়েছেন, তেমনি মহান করুণাময় আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য এমন কিছু নেক আমলও রেখেছেন যার মাধ্যমে বছরের সব মাসেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর তাওহিদ (একত্ববাদ) প্রতিষ্ঠা করা এবং তার ইবাদতে একনিষ্ঠ হওয়া। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ জাহান্নামের ওপর ওই ব্যক্তির দেহ হারাম করে দিয়েছেন, যে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে। এছাড়া নামাজের হেফাজত করাও জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম, বিশেষ করে ফজর ও আসরের নামাজ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, সূর্যোদয়ের আগের (ফজর) এবং সূর্যাস্তের আগের (আসর) নামাজ যে ব্যক্তি আদায় করবে, সে কখনোই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। যে ব্যক্তি জোহরের আগে চার রাকাত এবং পরে দুই রাকাত (সুন্নত) নামাজের হেফাজত করবে, মহান আল্লাহ তার ওপর জাহান্নাম হারাম করে দেবেন। (সুনানে তিরমিজি ও আবু দাউদ)

রোজা হলো জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার ঢাল ও মজবুত দুর্গ। রমজানের রোজা শেষ হয়ে গেলেও নফল রোজা বাকি আছে, যেমন শাওয়ালের ৬ রোজা, সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা এবং প্রতি মাসের আইয়ামে বিজ (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)-এর রোজা। আর সবচেয়ে উত্তম নফল রোজা হলো দাউদ (আ.)-এর রোজা অর্থাৎ একদিন রোজা রাখা এবং একদিন ছেড়ে দেওয়া।

হে ইমানদার ভ্রাতারা! জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো, উত্তম চরিত্র, নম্রতা এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন। হে লোকজন! যারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি চান, তারা নিজেদের আচরণে সহজ ও কোমল হন, আপনার ভাইদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করুন, হাসিমুখে থাকুন এবং তাদের প্রতি সহনশীল হন।

হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেব না, কার জন্য জাহান্নাম হারাম? এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম, যে মানুষের নিকটবর্তী (সহজসাধ্য), কোমল ও সহজ স্বভাবের।’ (সুনানে তিরমিজি) আর যাকে কন্যা সন্তান বা বোন দান করা হয়েছে এবং সে তাদের প্রতি দয়া করেছে, তাদের যতœ করেছে, তারা তার জন্য জাহান্নামের ঢাল হবে।

মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যার তিনটি কন্যা বা তিনজন বোন রয়েছে, অথবা দুটি কন্যা বা দুজন বোন রয়েছে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে এবং তাদের বিষয়ে মহান আল্লাহকে ভয় করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

মুসনাদে আহমদের অপর বর্ণনায় এসেছে, যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের প্রতি দয়া করবে এবং তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত।

হে বিশ্বাসীরা! সেই ব্যক্তিই প্রকৃত অক্ষম যে দোয়া করতে অক্ষম। জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা নাজাতের বড় অসিলা। সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত তখন বলে, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চায়, জাহান্নাম তখন বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।

মহান আল্লাহ তার নেককার ও মুত্তাকি বান্দাদের গুণাগুণ বর্ণনা করে বলেছেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই যারা জমিনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেলরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে সালাম। আর যারা তাদের রবের উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে রাত অতিবাহিত করে এবং যারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের আজাব সরিয়ে নিন, নিশ্চয়ই এর আজাব অতি ভয়াবহ। নিশ্চয়ই তা নিকৃষ্টতম অবস্থান ও আবাসস্থল। (সুরা ফুরকান ৬৩-৬৬)

মহান আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের তা থেকে রক্ষা করুন। মহান আল্লাহ আমার ও আপনাদের জন্য কোরআন ও সুন্নাহর মধ্যে বরকত দান করুন এবং এর আয়াত ও হেকমত দ্বারা আমাদের উপকৃত করুন। আমি আমার এই কথা বলছি এবং আমার ও আপনাদের সব গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারাও তার কাছে ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল।

হে বিশ্বাসীরা! মুমিন ব্যক্তি যেমন জাহান্নাম থেকে মুক্তির আমলগুলো খুঁজবে, তেমনি তাকে সেই কাজগুলো থেকেও সতর্ক থাকতে হবে, যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়। মানুষকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করার প্রধান কারণ হলো তাদের জিহ্বার ফসল, যেমনটি নবীজি (সা.) আমাদের জানিয়েছেন। কারণ জিহ্বার অপব্যবহার সমাজকে ধ্বংস করে, ভালোবাসা নষ্ট করে, বিদ্বেষ ছড়ায় এবং ঐক্য নষ্ট করে। বিশেষ করে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। তাই শরিয়ত গিবত ও চোগলখোরিকে হারাম করেছে এবং মুসলমানের সম্মান রক্ষার তাগিদ দিয়েছে।

মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্মান রক্ষা করবে, মহান আল্লাহর ওপর এটি হক বা পাওনা হয়ে যায় যে, তিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেত্রে যদি এটি হয়, তবে দেশের শাসক ও আলেমদের সম্মান রক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি।

হে মুসলিম ভ্রাতারা! কেয়ামতের দিন নাজাত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো নেক আমলের হেফাজত করা। সুনানে নাসায়িতে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) সাহাবিদের বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের ঢাল গ্রহণ করো। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কোনো শত্রু কি উপস্থিত হয়েছে? তিনি বললেন, না, বরং জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল। তোমরা বলো, ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’। এগুলো কেয়ামতের দিন উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী হিসেবে আসবে।

এছাড়া নবীজি (সা.) এমন কিছু মহৎ আমলের কথা বলেছেন, যা জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে। সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং যে চোখ আল্লাহর পথে (সীমান্তে) পাহারা দেয়। যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে চিন্তা করে এবং নিজের ত্রুটির কথা ভেবে আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, তার জন্য নাজাতের ওয়াদা রয়েছে। একইভাবে যে ব্যক্তি নিজের দেশ পাহারায় নিয়োজিত থাকে, সেটিও তার নাজাতের কারণ হবে।

হে মুমিনরা! আল্লাহ আপনাদের একটি মহৎ নির্দেশ দিয়েছেন, যার সূচনা তিনি নিজে করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও যথাযথভাবে সালাম পাঠ করো। (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।

হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার ও বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন ইব্রাহিম (আ.)-এর পরিবারের ওপর করেছেন। হে আল্লাহ! বরকত দান করুন মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার ও বংশধরদের ওপর, যেমন ইব্রাহিম (আ.)-এর পরিবারের ওপর করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি সন্তুষ্ট হন খুলাফায়ে রাশেদিন আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলি (রা.)-এর ওপর এবং সব সাহাবি ও তাবেয়িদের ওপর।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের মর্যাদা দান করুন। সব মুসলিম দেশকে নিরাপদ, শান্ত ও সমৃদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! যারা এই পবিত্র ভূমির ক্ষতি করতে চায়, তাদের ষড়যন্ত্র তাদের দিকেই ফিরিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের দ্বীন, নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা রক্ষা করুন। আমাদের নিরাপত্তারক্ষীদের এবং সীমান্তে নিয়োজিত সৈনিকদের হেফাজত করুন। হে আল্লাহ! আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইদের নিরাপত্তা, স্থিরতা ও প্রশান্তি দান করুন।

২৭ মার্চ শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান