চোকপয়েন্ট ঝুঁকিতে হুমকিতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমাধান: প্রতিবেদন

আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অধীক নির্ভরতার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলো (সংকীর্ণ জলপথ) প্রায়ই ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে ওঠায় দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা চরম সংকটে ফেলেছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই৩জি।

আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গবেষকরা বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটগুলো বার বার প্রমাণ করেছে আমদানি নির্ভর জ্বালানি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এ সংকট কাটাতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্য হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জলপথের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ আমদানিকৃত তেল ও এলএনজি-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এ ধরনের পথগুলো সাময়িকভাবে নয় বরং ঘন ঘন ঝুঁকি তৈরি করে। এমনকি পর্যাপ্ত তেল গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ থাকলেও এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়।

এই সংকটে শুধু একমুখী নয় বরং বাংলাদেশ বহুমাত্রিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে সংকট মোকাবিলার সীমিত সক্ষমতা দেশটিকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন—ভৌত বা আর্থিক—দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনটি আরও জানায়, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এখন শুধু ভৌত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তথাকথিত ‘পেপার চোকপয়েন্ট’—যেমন জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা, বীমা সুবিধা প্রত্যাহার, নীতিগত জটিলতা বা জলবায়ুজনিত কারণ—সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও বাজারকে দ্রুত অস্থির করে তুলতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

ই৩জি এর জ্বালানি রূপান্তর কর্মসুচীর প্রধান মারিয়া পোস্তুকোভা বলেন, “বাংলাদেশ চোকপয়েন্ট ঝুঁকির একেবারে সামনের সারিতে অবস্থান করছে। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার পাশাপাশি সীমিত আর্থিক ও সিস্টেমিক সুরক্ষার ফলে বৈশ্বিক যে কোনো সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে রূপ নেয়। অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শুধু চলমান হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার মতো ধাক্কা সামাল দেওয়া নয়, কারণ এটি বাংলাদেশের জন্য শেষ চোকপয়েন্ট সংকট নয়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুতায়ন এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো—যা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের সহায়তায় বাস্তবায়নযোগ্য করা দরকার।”
 
বাংলাদেশ ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় জ্বালানী আমদানিকারকদের ওপর বিশ্লেষণ চালিয়ে ই৩জি দেখেছে, কোনো দেশই চোকপয়েন্ট ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। তবে দেশভেদে ঝুঁকির মাত্রা ভিন্ন। এরমধ্যে এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট দিয়ে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দেশগুলোতে যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। সীমিত দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেশটিকে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। এমনকি সরাসরি সরবরাহ বন্ধ না হলেও, অন্য অঞ্চলের সংকটের প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় বাজারে।

ই৩জি এর বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ কূটনীতি কর্মচীর প্রধান মাধুরী জোশি বলেন, হরমুজ প্রণালীনির্ভর তেল ও এলএনজি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এশিয়ার দেশগুলোতে অসম প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভঙ্গুর চোকপয়েন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুতায়ন ও দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাড়ানোই সবচেয়ে টেকসই সমাধান।

প্রতিবেদনটি বলছে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরবরাহ বাড়ানোর চেয়ে ঝুঁকি কমানো বেশি জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া। বিদ্যুতায়ন, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রিড উন্নয়ন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছে ই৩জি।

গ্লোবাল ক্লিন পাওয়ার ডিপ্লোম্যাসি এর পলিসি অ্যাডভাইজর রিনো সুগিওকা বলেন, “বাংলাদেশের জন্য দ্রুত স্থিতিশীলতা অর্জনের পথ নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ নয়, বরং চাহিদা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা। জ্বালানি দক্ষতা এবং সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত ঝুঁকি কমাতে পারে, তবে গ্রিড আধুনিকীকরণ, ব্যাটারি সংরক্ষণ, এবং বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের মতো বড় রূপান্তরমূলক উদ্যোগগুলো নির্ভর করে স্বল্পসুদে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানোর ওপর। এসব ব্যাপারে নতুন সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”

চোকপয়েন্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় পাঁচ ধাপের একটি নীতিগত কাঠামো প্রস্তাব করেছে ই৩জি। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্প কাঠামোগত দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বরং আমদানি নির্ভর তেল-গ্যাস ক্রমান্বয়ে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।